রাজশাহী প্রতিনিধি
রাজশাহীতে কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে ১০ লাখ টাকা চাঁদা আদায়ের মিশনে নেমেছিলেন সাতজন পুলিশ সহ মোট আট । এ চক্রের সঙ্গে জড়িত ছিলেন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি), পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত), ওসির গাড়িচালকসহ তিনজন কনস্টেবল, একজনের স্ত্রী এবং কথিত এক সামাজিক সংগঠক ও তার স্ত্রী। ঘটনা জানাজানি হলে তাদের টাকা আদায়ের মিশন ব্যর্থ হয়ে যায় । এ বিষয়ে তদন্ত করছে আর এমপি পুলিশ।
ইতোমধ্যে অভিযুক্ত তিনজন পুলিশ কনস্টেবলকে থানা থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। আর ওসি ও পুলিশ পরিদর্শককে অন্য দুটি থানায় বদলি করা হয়েছে। তারা সবাই রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরএমপি) কাশিয়াডাঙ্গা থানায় কর্মরত ছিলেন। আরএমপির গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার হাফিজুর রহমান ঘটনাটি তদন্ত করছেন।
ওই প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি কাশিয়াডাঙ্গা থানা এলাকায় অবস্থিত। এর পরিচালক মারুফ হোসেন জানান, গত ১ সেপ্টেম্বর তিনি প্রশিক্ষণের উদ্বোধনের জন্য কাশিয়াডাঙ্গা থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আজিজুল বারীকে প্রধান অতিথি করেন। এর তিন দিন পর থেকে থানার পুলিশ তার সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করে এই বলে যে, তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে। কিন্তু কী অভিযোগ তা না জানিয়ে তাকে মীমাংসার জন্য ১০ লাখ টাকার চাপ দেওয়া হয়।
কাশিয়াডাঙ্গা থানার তৎকালীন পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) আবদুল আজিজ মন্ডল, ওসির গাড়িচালক সোহেল রানা ও কনস্টেবল মো. মাহবুব তাকে হোয়াটসঅ্যাপে বার বার ফোন করতে থাকেন ১০ লাখ টাকার জন্য। এরই মধ্যে তার প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সীমা খাতুন নামের একজন প্রশিক্ষণার্থী তাকে ম্যাসেঞ্জারে জানান, ‘তাদের কাছে তেমন কোন প্রমাণ নেই। তারা ৫ লাখ টাকা চায়।’ এই সীমা খাতুনের স্বামী মো. সাইফুজ্জামানও পুলিশ কনস্টেবল।
তিনিও কাশিয়াডাঙ্গা থানায় ছিলেন। সীমা স্বামীর ইউনিফর্ম পরে টিকটকে ভিডিও ছাড়ার কারণে গত বৃহস্পতিবার তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়েছে।
পুলিশ পরিদর্শক আজিজ মন্ডল যে মারুফকে টাকার জন্য চাপ দিচ্ছেন, এমন কল রেকর্ড পাওয়া গেছে। আজিজ মন্ডল হোয়াটসঅ্যাপে ফোন করলেও মারুফ তা অন্য মোবাইল দিয়ে ভিডিও করে রেখেছেন। এতে শোনা যাচ্ছে, আজিজ মন্ডল মারুফকে দেখা করার জন্য চাপ দিচ্ছেন। বলছেন, অভিযোগকারীর সঙ্গে বসতে হবে। মীমাংসা করতে হবে। আর মারুফ বলছেন, যে এমাউন্টের কথা বলা হয়েছে তা ম্যানেজ করতে পারেননি বলে তিনি দেখা করতে পারছেন না।
শুধু আজিজ মন্ডল একাই নয়, কনস্টেবল মাহবুব ও ওসির গাড়িচালক সোহেলও টাকার জন্য ফোন করতে থাকেন মারুফকে। সোহেল রানা ফোন করে বলেন, তিনি ওসির গাড়িচালক। তার কথা মানেই ওসির কথা। এমন পরিস্থিতিতে মারুফ একাধিকবার ওসি আজিজুল বারীর সঙ্গে দেখা করেন। কিন্তু ওসি তার সঙ্গে কোনো কথা না বলে ওসি তদন্ত ও দুই কনস্টেবলের সঙ্গেই আগে কথা বলার পরামর্শ দেন। একপর্যায়ে ৭ ডিসেম্বর মাহবুব ও সোহেল তার সঙ্গে দেখা করে ১০ হাজার টাকাও নিয়ে যান। মারুফ দূর থেকে এর ভিডিও করে রাখেন।
এই সমস্ত প্রমাণ এখন ঊর্দ্ধতন পুলিশ কর্মকর্তাদের হাতে। এ দুই কনস্টেবল টাকা নেওয়ার পরই তড়িঘড়ি করে দুদিন পর তাদের কাশিয়াডাঙ্গা থানা থেকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়। পরবর্তীতে পুলিশের পোশাক পরে সীমা খাতুনের ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হলে গত বৃহস্পতিবার তার স্বামী সাইফুজ্জামানকেও প্রত্যাহার করা হয়।
ভুক্তভোগী মারুফ অভিযোগ করে বলেন, তার কাছ থেকে যে টাকা আদায়ের পরিকল্পনা ছিল এর মূল পরিকল্পনাকারীই ছিলেন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের প্রশিক্ষণার্থী সীমা খাতুন। তিনি তার কনস্টেবল স্বামীকে দিয়ে পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেন। সীমা আরেক নারী প্রশিক্ষণার্থীর স্বামীকে দিয়ে লিখিত অভিযোগ করান যে, তার স্ত্রীকে ইচ্ছাকৃতভাবে ফেল করানো হয়েছে।
পাশাপাশি এতে প্রশিক্ষণার্থীদের যৌন হয়রানি করারও অভিযোগ করা হয়। মারুফ দাবি করেন, ইচ্ছাকৃতভাবে ফেল করানো হয়নি। যৌন হয়রানির অভিযোগও মিথ্যা। প্রকৃতপক্ষে তার কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিতে এ অভিযোগ করা হয়েছিল।
তিনি দাবি করেন, টাকা আদায়ের চেষ্টার সঙ্গে তৎকালীন ওসি আজিজুল বারীও যুক্ত ছিলেন। তাই তিনি বারবার ওসি তদন্ত এবং পুলিশ কনস্টেবলদের সঙ্গেই কথা বলতে বলেছিলেন। ঊর্দ্ধতন পুলিশ কর্মকর্তারা তাকে ডেকে ঘটনা জানার পর দুই কনস্টেবলকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। কিন্তু ওসি ও ওসি তদন্তের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাদের শুধু বদলি করা হয়েছে।
যিনি অভিযোগটি করেছিলেন, তিনি তার পরিচয় হিসেবে লিখেছিলেন ব্যবসায়ী ও সামাজিক সংগঠক। টাকা আদায়ে মিথ্যা অভিযোগ করার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি দাবি করেন, ‘আমার অভিযোগ মিথ্যা না। আর আমি এ চক্রের সঙ্গে জড়িতও নই। আমি অভিযোগ করার পরে ২০ ডিসেম্বর জানতে পারি যে, আমার অভিযোগ নিয়ে এত কিছু ঘটে গেছে।’ মারুফের বিরুদ্ধে করা অভিযোগের স্বপক্ষে প্রমাণ দেখতে চাইলে তিনি দেখাতে পারেননি।
কাশিয়াডাঙ্গা থানার তৎকালীন পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) আবদুল আজিজ মন্ডল এখন আছেন আরএমপির কর্ণহার থানায়। যোগাযোগ করা হলে তিনি টাকা চাওয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন। ফোনকল রেকর্ডের বিষয়ে জানতে চাইলে কোনো মন্তব্য না করে বলেন, ‘আমি এসব বিষয়ে কথা বলতে এখন চাই না। এগুলো আমাদের ঊর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ দেখছে। তাদের বলব।’
কাশিয়াডাঙ্গা থানার তৎকালীন ওসি আজিজুল বারী বর্তমানে আছেন আরএমপির দামকুড়া থানায়। তিনি দাবি করেন, এই ঘটনার সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন না। তার নাম ভাঙিয়ে কেউ টাকা আদায়ের চেষ্টা করলে দায়ভার তাদের। ইতোমধ্যে এ অভিযোগে দুজনকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
আরএমপির মুখপাত্র গাজিউর রহমান বলেন, ‘পুলিশ কর্মকর্তা ও কনস্টেবলদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ তা আমলে নিয়ে তদন্ত চলছে। নগর ডিবি পুলিশের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার হাফিজুর রহমান তদন্ত করছেন। যাদের বিরুদ্ধে প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে, তাদের ইতোমধ্যে থানা থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। তদন্ত শেষে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মেহেদী হাসান
কার্যালয়ঃ দেশ ভিলা, বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মিয়া সড়ক, জিটি স্কুল সংলগ্ন, টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ।
মোবাইলঃ ০১৭১৮-৫৬৫১৫৬, ০১৯৯৫-৩৮৩২৫৫
ইমেইলঃ mehadi.news@gmail.com
Copyright © 2026 Nabadhara. All rights reserved.