রাসেল আহমেদ,খুলনা প্রতিনিধি
খুলনা জেলায় চলমান খাদ্যশস্য সংগ্রহ মৌসুমে নতুন বস্তা কেনার আড়ালে পুরনো ও নিম্নমানের বস্তা সরবরাহের অভিযোগ উঠেছে। তেরখাদা উপজেলার খাদ্যগুদামে পাঠানো বস্তার একটি বড় অংশ পুরনো ও ব্যবহৃত হওয়ায় বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। এতে খাদ্য বিভাগে বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ ঘিরে শুরু হয়েছে আলোচনা ও সমালোচনা।
জানা গেছে, তেরখাদা খাদ্যগুদামে পাঠানো ২০ হাজার পিস বস্তার মধ্যে অন্তত ৮ হাজার পিস পুরনো বস্তা শনাক্ত হয়। বস্তাগুলোর গায়ে ব্যবহারের চিহ্ন স্পষ্ট ছিল। বিষয়টি ভিডিও ধারণ করে সংশ্লিষ্ট সরবরাহকারীকে জানানো হলে পরে সেগুলো নতুন বস্তা দিয়ে বদল করা হয়।
খাদ্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, খুলনা খাদ্য বিভাগের জন্য নতুন বস্তা ক্রয়ের দরপত্র আহ্বান করা হয়। দরপত্র শেষে মহেশ্বরপাশা খাদ্যগুদামে বস্তা সরবরাহ করা হয়। সেখান থেকে বিভিন্ন উপজেলা ও খাদ্যগুদামে এসব বস্তা বিতরণ করা হয়।
রূপসা উপজেলার আলাইপুর খাদ্যগুদামে ৫০ কেজির ৫০ হাজার ও ৩০ কেজির ১০ হাজার পিস, তেরখাদা খাদ্যগুদামে ৫০ কেজির ৩০ হাজার ও ৩০ কেজির ১০ হাজার পিস, ডুমুরিয়া খাদ্যগুদামে ৫০ কেজির ৫০ হাজার ও ৩০ কেজির ২০ হাজার পিস এবং ফুলতলা খাদ্যগুদামে ৫০ কেজির ৫০ হাজার ও ৩০ কেজির ২০ হাজার পিস বস্তা সরবরাহ করা হয়।
এছাড়া মংলা সাইলো ও মোংলা পোর্টে জাহাজ থেকে সরবরাহ করা বস্তার মধ্যেও অনুপযোগী পুরনো বস্তা পাওয়া যায়। পরে সেখান থেকে ৫০ কেজির ২৫ হাজার এবং ৩০ কেজির ১০ হাজার পিস বস্তা ফেরত পাঠানো হয়।
এ সংক্রান্ত একটি ভিডিওতে দেখা যায়, বস্তার গায়ে লেখা ‘শেখ হাসিনার বাংলাদেশ, ক্ষুধা হবে নিরুদ্দেশ’ স্লোগান আলকাতরা দিয়ে মুছে ফেলা হয়েছে। একই সঙ্গে বস্তার গায়ে উৎপাদন সাল হিসেবে ২০২২ লেখা রয়েছে, যা নতুন বস্তা সরবরাহের দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, টেন্ডার কার্যক্রম শেষ হয় প্রায় তিন মাস আগে। সে সময় টেন্ডার কমিটির প্রধান ছিলেন ফুলতলার পিসিএফ জাকির হোসেন, যিনি অতিরিক্ত দায়িত্বে খুলনার সহকারী জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের দায়িত্ব পালন করছিলেন। কার্যাদেশ পায় মেসার্স চন্দ্রদ্বীপ কনস্ট্রাকশন।
বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি খালিদ হোসেন অভিযোগ করে বলেন, “২ লাখ নতুন বস্তা কেনার নামে কোটি টাকার দুর্নীতি করা হয়েছে। নতুন বস্তার পরিবর্তে পুরনো ব্যবহৃত বস্তা কেনা হয়েছে, যা খাদ্য সংরক্ষণের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।”
তিনি বলেন, সরকারি হিসাবে ৩০ কেজির নতুন বস্তার দাম প্রতি পিস ৫০ টাকা এবং ৫০ কেজির বস্তার দাম ৯০ টাকা। অথচ পুরনো বস্তার বাজারদর যথাক্রমে ১৮–২০ টাকা ও ৩৮–৪০ টাকা। এই দামের ব্যবধানই বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের ইঙ্গিত দেয়।
মহেশ্বরপাশা খাদ্যগুদামের ম্যানেজার টিসিএফ মোশাররফ হোসেন ঢাকা পোস্টকে বলেন, “সর্বশেষ আমরা ২ লাখ বস্তা পেয়েছি। সব বস্তা একসঙ্গে খুলে দেখা সম্ভব হয় না। সাধারণত ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বস্তা পরীক্ষা করে বুঝে নেওয়া হয়। শর্ত অনুযায়ী কোনো সমস্যা ধরা পড়লে সরবরাহকারীকে তা রিপ্লেস করতে হয়।”
খুলনা জেলা খাদ্য কর্মকর্তা তানভীর হোসেন বলেন, “তেরখাদায় কিছু পুরনো বস্তা পাওয়া গিয়েছিল। সরবরাহকারীকে জানানো হলে সেগুলো নতুন বস্তা দিয়ে বদল করা হয়েছে। এত বড় পরিমাণ বস্তা একসঙ্গে পরীক্ষা করা কঠিন। নিয়ম অনুযায়ী ধাপে ধাপে যাচাই করেই সমস্যার সমাধান করা হয়।”
তবে স্থানীয়দের দাবি, এটি নিছক সরবরাহ ত্রুটি নয়; বরং নতুন বস্তার আড়ালে পুরনো বস্তা সরবরাহ করে সরকারি অর্থ আত্মসাতের একটি পরিকল্পিত চক্র জড়িত থাকতে পারে। এ ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।

