নিজস্ব প্রতিবেদক, গাজীপুর
গাজীপুর রাজবাড়ি মাঠে ১১ দলীয় জোটের নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেন,“জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় গেলে মনগড়া উন্নয়ন নয়, এমন উন্নয়ন হবে যার সুবিধাভোগী হবে আপামর জনগণ। আমরা কোনো জাত-পাত, ধর্ম-বর্ণের ভিত্তিতে বৈষম্য করবো না। ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র গড়াই আমাদের লক্ষ্য।”
তিনি বলেন, মায়েদের মর্যাদা বৃদ্ধি করা হবে এবং তারা নিজ নিজ ক্ষেত্রে পূর্ণ সম্মান ভোগ করবে। শ্রমিক ও নারীদের ক্ষেত্রে বিদ্যমান বেতন বৈষম্য দূর করা হবে। একই কাজের জন্য নারী-পুরুষের ভিন্ন বেতন এই দেশে আর থাকবে না বলেও তিনি প্রতিশ্রুতি দেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “গাজীপুর একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল হলেও এখানে শ্রমিকদের শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি রয়েছে। ইনসাফের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হলে শিল্পাঞ্চলকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা হবে ইনশাআল্লাহ।”
নারীদের অধিকার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সন্তান গর্ভে আসার পর থেকে জন্ম ও লালন-পালনের জন্য দুই থেকে আড়াই বছর নারীদের কর্মঘণ্টা পাঁচ ঘণ্টা নির্ধারণ করা হবে। বাকি তিন ঘণ্টা সন্তান লালনের জন্য বরাদ্দ থাকবে এবং সেই সময়ের বেতন সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে প্রদান করা হবে। প্রথমে সরকারি ও পরে বেসরকারি খাতে এ ব্যবস্থা কার্যকর করা হবে বলে তিনি জানান।
প্রতিপক্ষের সমালোচনার জবাবে জামায়াত আমীর বলেন, “সমালোচনার জবাব দেয়ার সময় আমাদের নেই। আমরা ক্ষমতায় গেলে কারোর প্রতি বেইনসাফি করবো না—এটাই আমাদের অঙ্গীকার।”
তিনি আরও বলেন, গাজীপুর ঘনবসতিপূর্ণ শিল্পাঞ্চল হওয়া সত্ত্বেও এখানকার রাস্তাঘাট, ড্রেনেজ, গ্যাস সরবরাহ ও টেকসই বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় ব্যাপক সমস্যা রয়েছে। অথচ জাতীয় জিডিপিতে গাজীপুরের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কৃষক, শ্রমিক ও শিল্পোদ্যোক্তাসহ প্রত্যেকের অবদান যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হবে।
মায়েদের সম্মান প্রসঙ্গে তিনি কঠোর ভাষায় বলেন, “যারা মায়েদের গায়ে হাত তোলে, মায়ের সন্তানেরা তাদের ক্ষমা করবে না। মাকে সম্মান করলে পুরো জাতি তোমাকে সম্মান করবে। জীবন দেবো, কিন্তু মায়ের সম্মান নিয়ে কাগাজীপুরউকে ছিনিমিনি খেলতে দেব না।”
তিনি আগামী ১২ তারিখ ইনসাফের পক্ষে রায় দেয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “দেশ সেবার সুযোগ পেলে গাজীপুরের প্রতি কোনো বেইনসাফি করা হবে না।” এসময় গাজীপুর ও নরসিংদীর ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীদের জনতার সঙ্গে পরিচয় প্রতীক তুলে দেন। তিনি গাজীপুর-১ আসনে জোটের প্রার্থী শাহ আলম বকশি (দাঁড়ি পাল্লা), গাজীপুর-২ আসনে অ্যাডভোকেট আলী নাসের খান (শাপলা কলি), গাজীপুর-৩ আসনে মাওলানা এহসানুল হক (রিকশা প্রতীক), গাজীপুর-৪ আসনে সালাউদ্দিন আইউবী (দাঁড়ি পাল্লা), গাজীপুর-৫ আসনে খায়রুল হাসান (দাঁড়ি পাল্লা) এবং নরসিংদী-২ আসনে এনসিপির প্রার্থী সারোয়ার তোষারকে (শাপলা কলি) জনতার সামনে পরিচয় করিয়ে দেন।
গাজীপুর মহানগর জামায়াতের আমীর অধ্যাপক জামাল উদ্দীনের সভাপতিত্বে এবং সেক্রেটারি আ স ম ফারুকের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম, তা’মীরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসার সাবেক অধ্যক্ষ মাওলানা যায়নুল আবেদীন, গাজীপুর জেলা জামায়াতের আমীর ড. জাহাঙ্গীর আলম, কেন্দ্রীয় শুরা সদস্য খায়রুল হাসান, মো. হোসেন আলী, সালাউদ্দিন আইউবী, অ্যাডভোকেট শামসুল হক ভূঁইয়া, অধ্যক্ষ মুস্তাফিজুর রহমান প্রমুখ।
রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ইঙ্গিত করে জামায়াত আমীর বলেন, “৫ তারিখের পরই দেখা যাচ্ছে, কিছু ভাই অতীতের মতো আবারও মজলুমদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে। তারা ক্ষমতায় এলে কী করবে, তা এখনই জনগণের সামনে পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে। মুখে দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ার কথা বললেও, দুর্নীতি দূর করতে হলে আগে নিজের ঘর থেকেই শুরু করতে হয়। ঋণখেলাপীদের বগলের নিচে রেখে কেউ কখনো দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়তে পারে না।”
তিনি বলেন, “যারা ক্ষমতায় যাওয়ার আগেই এই আচরণ দেখাচ্ছে, তারা ক্ষমতায় গেলে ব্যবসায়ী, শিল্পোদ্যোক্তা, কৃষক ও শ্রমিক কেউই নিরাপদ থাকবে না। তারা মানুষের শান্তি ও স্থিতিশীলতা তছনছ করে দেবে।”
ডা. শফিকুর রহমান আরও বলেন, “আমি জামায়াতে ইসলামীর একক নিরাপত্তা বা বিজয় চাই না; আমি চাই সারা দেশের নিরাপত্তা, শান্তি ও জনগণের শাসন। আমরা জনগণের ঐক্য চাই। কেউ যদি অন্যায়ভাবে কারও ওপর হাত তোলে, তাহলে সেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে কঠোরভাবে দাঁড়াতে হবে।”

