হুমায়ন কবির মিরাজ, বেনাপোল
সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যশোর-১ (শার্শা) আসনে বিজয়ী হয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী ও কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মাওলানা আজিজুর রহমান। দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ১৭ হাজার ৩৭৭ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী নুরুজ্জামান লিটন (ধানের শীষ) পেয়েছেন ৯২ হাজার ৯৯৫ ভোট। ভোটের ব্যবধান ২৪ হাজার ৩৮২।
এ আসনে মোট ভোটার ছিলেন ৩ লাখ ১১ হাজার ৬৩৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৫৫ হাজার ৮০৭, নারী ১ লাখ ৫৫ হাজার ৮২৩ এবং হিজড়া ভোটার ৩ জন। মোট ১০২টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২ লাখ ১৩ হাজার ৪৮০ জন ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। ভোটের হার ৬৬ দশমিক ৫২ শতাংশ।
এ আসনে চারজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। জামায়াতের প্রার্থী আজিজুর রহমানের পর বিএনপির নুরুজ্জামান লিটন ছাড়াও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থী বক্তিয়ার রহমান পেয়েছেন ১ হাজার ৭৪১ ভোট এবং জাতীয় পার্টির লাঙ্গল প্রতীকের প্রার্থী জাহাঙ্গীর কবির চঞ্চল পেয়েছেন ১ হাজার ৩৬৭ ভোট।
শার্শা উপজেলা দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোল স্থলবন্দরকে ঘিরে গড়ে ওঠা একটি গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় এলাকা। ১১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত এ আসনটি সব রাজনৈতিক দলের কাছেই কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাধীনতার পর অনুষ্ঠিত ১২টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফলে দেখা যায়, এ আসনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সর্বাধিক সাতবার জয়ী হয়েছে। দলটির প্রার্থী তবিবর রহমান সরদার ১৯৭৩, ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে শেখ আফিল উদ্দিন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল এ আসনে তিনবার বিজয়ী হয়েছে—১৯৭৯ সালে আলী তারেক, ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে মফিকুল হাসান তৃপ্তি এবং ২০০১ সালে আলী কদর সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এছাড়া ১৯৮৬ সালে জামায়াতের নূর হুসাইন এবং ১৯৮৮ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী কেএম নজরুল ইসলাম জয়ী হন।
তবে চলতি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও তাদের মিত্রদের মাঠপর্যায়ের তৎপরতা না থাকায় মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে।
নির্বাচনের আগে বিএনপিতে মনোনয়ন নিয়ে চরম দ্বন্দ্ব ছিল। সাবেক সংসদ সদস্য ও কেন্দ্রীয় সাবেক দপ্তর সম্পাদক মফিকুল হাসান তৃপ্তিকে প্রথমে মনোনয়ন দেওয়া হলেও পরে চূড়ান্ত মনোনয়ন পান উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নুরুজ্জামান লিটন। এ নিয়ে তৃণমূলে বিভক্তি তৈরি হয় বলে দলীয় সূত্রে জানা যায়।
স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মনোনয়ন পরিবর্তন ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল বিএনপির ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলেছে। মফিকুল হাসান তৃপ্তি দীর্ঘদিন মাঠে সক্রিয় থাকলেও শেষ পর্যন্ত মনোনয়ন না পাওয়া, পাশাপাশি দীর্ঘদিনের ত্যাগী নেতা উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবুল হাসান জহির ও সাবেক সভাপতি খায়রুজ্জামান মধু মনোনয়ন প্রত্যাশী থেকে বঞ্চিত হওয়ায় তাদের সমর্থকদের একটি অংশ নিষ্ক্রিয় ছিলেন বা অন্যদিকে ঝুঁকেছেন, এমন আলোচনা রয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, বিএনপির ভেতরে ঐক্য থাকলে ফল ভিন্ন হতে পারত। অনেকেই ক্ষুব্ধ ছিলেন। নির্বাচনের দিন কেন্দ্রে ভোট দিতে আসা কয়েকজন ভোটারও একই ধরনের মন্তব্য করেন।
তবে বিএনপির নেতারা আনুষ্ঠানিকভাবে বিভেদের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাদের দাবি, সবাই দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করেছেন।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে শুরু থেকেই এককভাবে মাঠে ছিলেন মাওলানা আজিজুর রহমান। দলীয় নেতাকর্মীরা সমন্বিতভাবে প্রচারণা চালান। বিভিন্ন ওয়ার্ড ও ইউনিয়নে নিয়মিত গণসংযোগ, পথসভা ও ঘরোয়া বৈঠকের মাধ্যমে সংগঠিত প্রচারণা পরিচালনা করা হয়। নারী ভোটারদের একটি বড় অংশ তার পক্ষে ভোট দিয়েছেন বলেও স্থানীয়ভাবে আলোচনা রয়েছে।
বিজয়োত্তর প্রতিক্রিয়ায় মাওলানা আজিজুর রহমান বলেন, শার্শাবাসী দুর্নীতিমুক্ত ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের পক্ষে রায় দিয়েছেন। আমি সবার প্রতিনিধি হয়ে কাজ করতে চাই।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বেনাপোল স্থলবন্দরকেন্দ্রিক এ আসনে বিজয়ী প্রার্থীর সামনে উন্নয়ন, বন্দর ব্যবস্থাপনা, চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ ও কর্মসংস্থান—এসব বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শার্শা আসনের এ ফলাফল স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। বিশেষ করে দীর্ঘদিনের মিত্র বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতার এই ফল আগামী দিনে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের রাজনীতিতে প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
উল্লেখ্য, ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মাওলানা আজিজুর রহমান ৫ হাজার ৮৫৬ ভোটের ব্যবধানে আওয়ামী লীগের প্রার্থী শেখ আফিল উদ্দিনের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন। তখন নৌকা প্রতীক পেয়েছিল ৯৪ হাজার ৫৫৬ ভোট এবং দাঁড়িপাল্লা প্রতীক পেয়েছিল ৮৮ হাজার ৭০০ ভোট। ভোটের পার্থক্য ছিল ৬ দশমিক ৬০ শতাংশ।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মেহেদী হাসান
কার্যালয়ঃ দেশ ভিলা, বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মিয়া সড়ক, জিটি স্কুল সংলগ্ন, টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ।
মোবাইলঃ ০১৭১৮-৫৬৫১৫৬, ০১৯৯৫-৩৮৩২৫৫
ইমেইলঃ mehadi.news@gmail.com
Copyright © 2026 Nabadhara. All rights reserved.