ভাণ্ডারিয়া (পিরোজপুর) প্রতিনিধি
মাছ ধরার মৌসুম চললেও পিরোজপুরের উপকূলীয় উপজেলা ভাণ্ডারিয়ায় গভীর সংকটে পড়েছেন সমুদ্রগামী জেলেরা। জ্বালানি সংকট, লোকসান, অবৈধ ট্রলিং, জলদস্যু আতঙ্কসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত হয়ে উপজেলার ফিশিং খাত প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। শতাধিক বোট থাকলেও বর্তমানে মাত্র ৫০টির মতো বোট সমুদ্রে যাচ্ছে, তাও নানা প্রতিবন্ধকতায় থমকে রয়েছে।
উপজেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা যায়, ভাণ্ডারিয়ায় লাইসেন্সপ্রাপ্ত ৭২টি ফিশিং বোটসহ মোট প্রায় ১১০টি বোট রয়েছে। এসব বোটে প্রায় ১১০০ জেলে জীবিকা নির্বাহ করলেও বাস্তবে খুব কমসংখ্যক বোটই নিয়মিত মাছ ধরতে পারছে। ফলে জেলেদের পরিবারসহ প্রায় চার হাজার মানুষ সরাসরি ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে সবচেয়ে বড় সংকট জ্বালানি। একটি বোটের সমুদ্রে যেতে গড়ে ৭-৮ ব্যারেল জ্বালানি প্রয়োজন হলেও তা সহজে পাওয়া যাচ্ছে না। আবার পাওয়া গেলেও প্রতি ২০০ লিটারের ব্যারেলে অতিরিক্ত ৪-৫ হাজার টাকা বেশি দিতে হচ্ছে। এতে খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেক জেলে সমুদ্রে যেতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন।
এছাড়া ১০-১২ দিনের একটি ট্রিপে প্রায় ৩ লাখ টাকা খরচ হলেও মাছ বিক্রি করে আয় হচ্ছে গড়ে ২ লাখ টাকার মতো। ফলে প্রতিটি ট্রিপেই লোকসানে পড়ছেন জেলেরা। টানা লোকসানের কারণে অনেকে ঋণের বোঝা কাঁধে নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন, আবার কেউ কেউ পেশা বদলে দিনমজুরির কাজ বেছে নিচ্ছেন।
জেলেদের অভিযোগ, সমুদ্রে বড় আকারের ইস্পাত বডির ট্রলিং জাহাজ তাদের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব জাহাজ জাল টেনে নেওয়ার সময় ছোট বোটের জাল ছিঁড়ে ফেলে, ফলে কয়েক লাখ টাকার ক্ষতি হয়। একই সঙ্গে সমুদ্রে পাতা অসংখ্য বাঁধা জালের কারণেও মাছ ধরা ব্যাহত হচ্ছে।
এদিকে সম্প্রতি জলদস্যুদের উৎপাতও বেড়েছে বলে জানিয়েছেন জেলেরা। সমুদ্রে লুটপাট, জাল ও মাছ ছিনিয়ে নেওয়া, এমনকি মাঝিদের অপহরণ করে মুক্তিপণ দাবির ঘটনাও ঘটছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে সমুদ্রে যাওয়া এখন শুধু লোকসানের নয়, জীবনের ঝুঁকির বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চরখালী এলাকার এফবি ‘মায়ের দোয়া’ বোটের মাঝি আমির হোসেন বলেন, “আগে নিয়মিত সমুদ্রে গিয়ে কোনোভাবে সংসার চালানো যেত। এখন খরচই ওঠে না, প্রতিবারই লোকসান হচ্ছে।”
একই এলাকার মাঝি সবুজ হোসেন বলেন, “জালই আমাদের মূল পুঁজি। জাল নষ্ট হলে আমরা পথে বসে যাই, কিন্তু কোনো ক্ষতিপূরণ পাই না।”
এফবি ‘ইমন এন্টারপ্রাইজ’ বোটের মাঝি মনির উকিল বলেন, “সমুদ্রে এখন নিরাপত্তা নেই। বড় ট্রলার আর বিদেশি জেলেদের কারণে আমরা টিকতে পারছি না।”
এ পরিস্থিতিতে জেলেরা জ্বালানির মূল্য নিয়ন্ত্রণ, অবৈধ ট্রলিং বন্ধ, জলদস্যু দমন এবং সমুদ্রে নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানিয়েছেন।
পিরোজপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সঞ্জীব সন্নামত জানান, আগামী ১৫ এপ্রিল থেকে ১১ জুন পর্যন্ত ৫৮ দিনের মৎস্য আহরণ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে। এ সময়ে সমুদ্রে মাছ ধরা বন্ধ থাকবে। বর্তমানে যারা সমুদ্রে রয়েছেন, তাদের দ্রুত উপকূলে ফিরে আসার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও জানান, সমুদ্রে ট্রলিং সম্পূর্ণ অবৈধ এবং এর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মেহেদী হাসান
কার্যালয়ঃ দেশ ভিলা, বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মিয়া সড়ক, জিটি স্কুল সংলগ্ন, টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ।
মোবাইলঃ ০১৭১৮-৫৬৫১৫৬, ০১৯৯৫-৩৮৩২৫৫
ইমেইলঃ mehadi.news@gmail.com
Copyright © 2026 Nabadhara. All rights reserved.