যশোর প্রতিনিধি
যশোরের বিভিন্ন গ্রামে গাভী ছাড়াই রাসায়নিক দিয়ে ‘নকল দুধ’ উৎপাদনের ভয়ংকর চিত্র উঠে এসেছে। উদ্বেগজনক তথ্য হলো, এসব ভেজাল দুধ কিনে নিচ্ছে দেশের নামী চেইনশপগুলো, যা ভোক্তাদের জন্য মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।
গত ৬ এপ্রিল কেশবপুর উপজেলার ভেরচি ঘোষপাড়ায় র্যাব, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং নিরাপদ খাদ্য অধিদপ্তরের যৌথ অভিযানে এই চাঞ্চল্যকর তথ্যের প্রমাণ পাওয়া যায়। অভিযানে দেখা যায়, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী কোনো গাভী ছাড়াই সিলিকন জেল ও কেমিক্যাল ব্যবহার করে দুধ তৈরি করছে এবং তা বিভিন্ন কোম্পানির কাছে সরবরাহ করছে।
অভিযানে আটক ব্যবসায়ী অপু ঘোষ স্বীকার করেন, মাত্র ১০০-১৫০ টাকা খরচ করে এক কেজি সিলিকন জেল দিয়ে প্রায় ১০ কেজি নকল দুধ তৈরি করা সম্ভব। ইউটিউব দেখে শেখা এই পদ্ধতিতে তৈরি দুধ তিনি নিয়মিত আড়ং, প্রাণ ও আকিজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিক্রি করতেন। অভিযানে তার কাছ থেকে নকল দুধ তৈরির কাঁচামালও জব্দ করা হয়।
স্থানীয় আরেক ব্যবসায়ী দেব ঘোষ জানান, এলাকায় অন্তত ১৫-২০ জন এভাবে নিয়মিত ভেজাল দুধ উৎপাদন করছে। তাদের দাবি, দুধ পরীক্ষা হলেও ‘মাসিক সিস্টেমের’ মাধ্যমে তা সহজেই পাশ করানো হয়।
জেলা প্রাণিসম্পদ অফিস সূত্রে জানা যায়, যশোরে বিভিন্ন কোম্পানির প্রায় ৫০টি দুধ সংগ্রহ কেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে আড়ংয়ের ২১টি, আকিজের ১২টি এবং প্রাণের ১১টি কেন্দ্র রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব কেন্দ্রের আশেপাশেই গড়ে উঠেছে নকল দুধ তৈরির কারখানা।
অভিযান চলাকালে একটি দুধ সংগ্রহ কেন্দ্রের ‘কেমিস্ট’ পরিচয়ধারী মামুনের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সনদ পাওয়া যায়নি। নিরাপদ খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ছাড়া দুধের মান পরীক্ষা করা সম্পূর্ণ অবৈধ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দুধে ব্যবহৃত সিলিকন জেল ও কস্টিক সোডা মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এগুলো দীর্ঘদিন গ্রহণ করলে কিডনি বিকল, লিভার সিরোসিস, আলসার এমনকি ক্যানসারের মতো প্রাণঘাতী রোগ হতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব আরও ভয়াবহ।
অভিযানে ভোক্তা অধিকার আইন অনুযায়ী দুই ব্যবসায়ীকে মোট ২ লাখ ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তর জানিয়েছে, এ ধরনের ভেজাল খাদ্য উৎপাদন ও বিপণনের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
র্যাব-৬ এর কোম্পানি কমান্ডার মেজর ফজলে রাব্বি প্রিন্স বলেন, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে এবং ভবিষ্যতেও এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।
স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, অসাধু ব্যবসায়ী এবং কিছু সংগ্রহ কেন্দ্রের দায়িত্বশীলদের যোগসাজশে দীর্ঘদিন ধরে এই অবৈধ কারবার চলছে। তারা জড়িত সব পক্ষের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

