আলীকদম(বান্দরবান)প্রতিনিধি
আলীকদম উপজেলার তিনটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের অনুপস্থিতি, বর্গা (অস্থায়ী) শিক্ষক দিয়ে বিদ্যালয় পরিচালনা এবং মাসের পর মাস শ্রেণি কার্যক্রম বন্ধ থাকার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় অভিভাবক ও এলাকাবাসীর দাবি, নিয়মিত বেতন তুললেও সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের পাঠদান করছেন না।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিদ্যালয়ে শিক্ষক না থাকায় শিশুদের শিক্ষা কার্যক্রম কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। শিক্ষকদের বিদ্যালয়বিমুখতায় বছরের পর বছরেও শিক্ষার আলো পৌঁছেনি এসব এলাকায়। শিক্ষার্থীরা বই-খাতা নিয়ে স্কুলে গিয়ে কিছুক্ষণ খেলাধুলা করে বাড়ি ফিরে আসে।
সম্প্রতি কুরুকপাতা ইউনিয়নের কমচঙ ইয়ুংছা মাওরুমপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, খিদুপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও রাংলাই দাংলিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, কয়েকজন শিক্ষার্থী উপস্থিত থাকলেও কোনো শিক্ষক নেই। প্রতিটি বিদ্যালয়ে একজন করে বর্গা শিক্ষক দিয়ে বিদ্যালয়ের কাগজপত্র হালনাগাদ ও স্কুল খোলা রাখার কাজ করানো হচ্ছে।
তবে নিয়মিত শ্রেণি কার্যক্রমের কোনো অস্তিত্ব নেই। শ্রেণিকক্ষের টেবিল-চেয়ারে ধুলো জমে থাকতে দেখা গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বছরের পর বছর ধরে শিক্ষকরা বিদ্যালয়ে আসেন না। দুই-তিন মাস পর একদিন এসে রাতযাপন করে পরদিন চলে যান। এতে শিশুদের পড়াশোনা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
ইয়ুংছা মাওরুমপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক অভিভাবক বলেন, “পাঁচজন শিক্ষক আছে। তাদের মধ্যে অন্তত দুজন যদি নিয়মিত ১০ দিনও ক্লাস নিতেন, তাহলেও আপত্তি ছিল না। সরকার স্কুল করেছে, কিন্তু সেই স্কুল এখন আমাদের জন্য গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
খিদুপাড়ার বাসিন্দা তুমলন ম্রো বলেন, “এ বছর মাত্র তিনবার শিক্ষকরা স্কুলে এসেছেন। এখানে আসতে না পারলে কেন তাদের চাকরি দেওয়া হয়েছে? অভিযোগ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে গেছি। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা হয় না। শুনেছি, টাকা দিয়ে সব ঠিক রাখা হয়।”
জানা গেছে, ২০১০ সালে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি)-এর অর্থায়নে বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের উদ্যোগে আলীকদম উপজেলায় ২০টি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করা হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, বিদ্যালয়গুলোর অনেকগুলো দীর্ঘদিন কার্যক্রমহীন থাকলেও ২০১৭ সালে জাতীয়করণ করা হয়। সে সময় ঘুষ ও অনিয়মের মাধ্যমে অযোগ্য ব্যক্তিদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক শিক্ষক বলেন, “২০টি স্কুলের মধ্যে সবমিলিয়ে ৩ থেকে ৪টি স্কুল চলে। অন্য স্কুলের শিক্ষকরা নিয়মিত যান না। শিক্ষা অফিসও বিষয়টি জানে। এর জন্য ঘুষও দিতে হয়।”
খিদুপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. নাঈম বলেন, “বিদ্যালয়গুলো অনেক দুর্গম এলাকায় হওয়ায় নিয়মিত যাওয়া সম্ভব হয় না। পার্বত্য মন্ত্রীর পিএস আমার বন্ধু। তার সঙ্গে কথা হয়েছে। বদলির জন্য চেষ্টা করছি।”
অন্য এক শিক্ষক আরিফ বিল্লাহ বলেন, “ঈদের পরে একবার গিয়েছিলাম। রাতে থেকে পরদিন চলে এসেছি।”
এদিকে রাংলাই দাংলিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নুক্যএ মংয়ের বিরুদ্ধে মোবাইলে অনলাইন ক্যাসিনো খেলায় আসক্ত থাকার অভিযোগ তুলেছেন সহকর্মীরাই।
অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের কাছ থেকে মাসোহারা নিয়ে এসব অনিয়মের বিষয়ে নীরব রয়েছে উপজেলা শিক্ষা অফিস। কয়েকজন শিক্ষক দাবি করেন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের কিছু কর্মকর্তাও এই সুবিধার অংশ পান।
মংচিং হেডম্যানপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নুরুল আবচার বলেন, “আলীকদমে প্রাথমিক শিক্ষার বর্তমান অবস্থা ভালো না। কিছু প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের অনুপস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে, যার ফলে যারা নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসেন ও পাঠদান করেন, তাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। আমরা চাই, সদ্য ইউএনডিপির অধীনে থাকা স্কুলগুলোর শিক্ষকরা নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকবেন এবং দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করবেন। তাদের অবহেলার কারণে আমাদের সম্মান নষ্ট হচ্ছে।”
তবে আলীকদম উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শামসুল আলম বলেন, “শিক্ষকরা নিয়মিত বিদ্যালয়ে না গিয়ে বেতন নিচ্ছেন—এমন অভিযোগ আমাদের নজরে এসেছে। নিয়মিত উপস্থিত না থাকলে বেতন বন্ধ করা হবে। কেউ স্কুলে না গিয়ে বেতন তুলে থাকলে তা ফেরত নেওয়ার বিষয়েও কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।” তবে মাসোহারা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি।
মনজুর আলম বলেন, “যোগদানের পর থেকেই কয়েকটি বিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ পেয়েছি। শিক্ষকরা নিয়মিত স্কুলে যান না এবং বর্গা শিক্ষক দিয়ে বিদ্যালয় চালানোর অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন অভিযোগে ১৩ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে জেলা পরিষদের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। নতুন করে যে তিনটি বিদ্যালয়ের অভিযোগ এসেছে, সেগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মেহেদী হাসান
কার্যালয়ঃ দেশ ভিলা, বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মিয়া সড়ক, জিটি স্কুল সংলগ্ন, টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ।
মোবাইলঃ ০১৭১৮-৫৬৫১৫৬, ০১৯৯৫-৩৮৩২৫৫
ইমেইলঃ mehadi.news@gmail.com
Copyright © 2026 Nabadhara. All rights reserved.