মফিজুল ইসলাম,ঝিনাইদহ প্রতিনিধি
যে ঘরের বারান্দায় আজ ভোরের আলোয় নতুন ধান ঘরে তোলার নবান্নের আনন্দ থাকার কথা ছিল, সেই চেনা আঙিনাই এখন রূপ নিয়েছে এক নিথর শ্মশানে। ঝিনাইদহ সদর উপজেলার গাগান্না গ্রামে এক নির্মম, বোবা করে দেওয়া ট্র্যাজেডিতে এক লহমায় নিভে গেল দুটি তাজা প্রাণ। বৈদ্যুতিক তারের মরণ-ছোবলে চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেলেন মজিবর খান ও তাঁর অর্ধাঙ্গিনী মোমেনা খাতুন। জীবনের সুখ-দুঃখের পথ যিনি একসাথে পাড়ি দিয়েছিলেন, মরণের ওপাড়ে যাওয়ার সময়েও তাঁরা একে অপরকে ছেড়ে গেলেন না।
আজ সকালে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনায় গাগান্না গ্রামের আকাশ-বাতাস যেন আজ এক গভীর, বিষাদময় কান্নায় ভেঙে পড়েছে।
নিহতরা হলেন— গ্রামের খেটে খাওয়া সরল মানুষ মজিবর খান এবং তাঁর ভালোবাসার চাদরে জড়ানো স্ত্রী মোমেনা খাতুন।
পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আজ সোমবার ভোরের কুয়াশা কাটার আগেই মাঠের সোনালী ধান পরিষ্কার করার জন্য মজিবর খান ঘরের বৈদ্যুতিক ফ্যানটি ঠিক করতে যান। কিন্তু তিনি জানতেন না, সেখানে ওত পেতে আছে এক অদৃশ্য যমদূত। ফ্যানে হাত দেওয়া মাত্রই বিদ্যুতের তীব্র আঘাতে ছটফট করে ওঠেন মজিবর। ঠিক সেই মুহূর্তে, ঘরের ভেতর থেকে স্বামীর এই মরণ-চিৎকার শুনতে পান স্ত্রী মোমেনা খাতুন। চোখের সামনে নিজের জীবনের চেয়েও প্রিয় মানুষকে মৃত্যুর মুখে ছটফট করতে দেখে মোমেনা আর নিজের অস্তিত্বের কথা ভাবেননি। কোনোরকম আত্মরক্ষার চিন্তা না করে, কেবল স্বামীকে বাঁচানোর এক অদম্য আকুলতায় বুক চিরে ছুটে যান তিনি। নিজের জীবন বাজি রেখে স্বামীকে টেনে তুলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু হায় রে নিয়তি! স্বামীকে তো ফেরানো গেলই না, উল্টো সেই মরণ-ফাঁদ কেড়ে নিল মোমেনার প্রাণও। মৃত্যুর শেষ মুহূর্তেও হয়তো একে অপরকে জড়িয়ে ধরে বাঁচার শেষ চেষ্টা করেছিলেন তাঁরা। আর সেই শেষ আলিঙ্গনাবদ্ধ অবস্থাতেই চিরতরে নিথর হয়ে গেল দুটি হৃদয়। মুহূর্তের মধ্যে এই খবর ছড়িয়ে পড়লে স্তব্ধ হয়ে যায় পুরো এলাকা।
বাবা-মায়ের এমন আকস্মিক ও বীভৎস মৃত্যুর খবর পেয়ে ছুটে আসে সন্তানরা। উঠোনে ছড়িয়ে থাকা ধান আর তার মাঝে শুইয়ে রাখা বাবা-মায়ের নিথর দেহের ওপর আছড়ে পড়ে তাদের বুক ফাটানো আর্তনাদ—"ও আব্বা, ও আম্মা, তোমরা কথা কও না কেন? আমাদের একা থুয়ে তোমরা একসাথে কই চলে গেলা!" সন্তানদের এই গগনবিদারী আহাজারিতে সেখানে উপস্থিত শত শত প্রতিবেশীর চোখ ফেটে জল নেমে আসে। পুরো গ্রামের বাতাস আজ ভারী ও বিষণ্ন। স্তব্ধ প্রতিবেশীরা ডুকরে কেঁদে উঠে বলছেন, "ওরা সারাজীবন একসাথেই হাসিমুখে চলত। আজ মরণও ওদের আলাদা করতে পারল না। কিন্তু সন্তানদের এভাবে এতিম করে এক নিমেষে চলে যাওয়া কোনোভাবেই সহ্য করা যায় না।" সোনার ফসল ঘরে তোলার আনন্দকে এক নিমেষে এক বুক বিষাদে পরিণত করে, সন্তানদের বুকে এক জনমের শূন্যতা এঁকে দিয়ে মজিবর ও মোমেনা চলে গেলেন এক অন্তহীন না ফেরার দেশে। গাগান্না গ্রামের প্রতিটি ঘরে আজ উনুন জ্বলেনি, বিষাদের এক কাল মেঘ যেন থমকে আছে পুরো জনপদে।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মেহেদী হাসান
কার্যালয়ঃ দেশ ভিলা, বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মিয়া সড়ক, জিটি স্কুল সংলগ্ন, টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ।
মোবাইলঃ ০১৭১৮-৫৬৫১৫৬, ০১৯৯৫-৩৮৩২৫৫
ইমেইলঃ mehadi.news@gmail.com
Copyright © 2026 Nabadhara. All rights reserved.