যশোর প্রতিনিধি
আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে যশোরে কুরবানির পশু প্রস্তুত করতে ব্যস্ত সময় পার করছেন খামারি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা। জেলার প্রায় ১৪ হাজার খামারি এবার লক্ষাধিক পশু প্রস্তুত করেছেন। স্থানীয় চাহিদা পূরণ করেও অন্য জেলায় পশু সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছে প্রাণিসম্পদ বিভাগ। তবে পশুর ন্যায্যমূল্য পাওয়া নিয়ে এখনও শঙ্কায় রয়েছেন খামারিরা।
জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, যশোরের আট উপজেলায় এবার কুরবানির জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে ১ লাখ ১৭ হাজার ৯৭৭টি পশু। এর মধ্যে গরু রয়েছে ৩৬ হাজার ২৫৯টি, ছাগল ৮১ হাজার ২৭৬টি এবং ভেড়া ৪৪২টি।
জেলায় কুরবানির পশুর চাহিদা রয়েছে ৯৫ হাজার ৮১২টি। ফলে স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে অতিরিক্ত ১৪ হাজার ৮৪৯টি পশু দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
ঈদ সামনে রেখে যশোরের গ্রামাঞ্চলের খামারগুলোতে এখন বাড়তি যত্নে লালন-পালন করা হচ্ছে গরু, ছাগল ও ভেড়া। কয়েক মাসের শ্রম, বিনিয়োগ ও স্বপ্ন ঘিরে কুরবানির বাজারকে কেন্দ্র করে বড় প্রত্যাশা থাকলেও খামারিদের মনে রয়েছে অনিশ্চয়তা।
গত বছরের কুরবানির বাজারে লোকসান, শেষ মুহূর্তে কম দামে পশু বিক্রি, অবিক্রীত গরু নিয়ে বাড়ি ফেরা এবং বাজার সিন্ডিকেটের অভিযোগ এখনও অনেক খামারিকে হতাশ করে রেখেছে। ফলে পর্যাপ্ত পশু সরবরাহ থাকলেও ন্যায্যমূল্য পাওয়া নিয়ে উদ্বেগ কাটছে না।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা সিদ্দিকুর রহমান বলেন, “এবার পশু বিক্রি থেকে কয়েকশ কোটি টাকার বাণিজ্য হবে বলে আশা করছি। একই সঙ্গে যশোরের কুরবানির চামড়া দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বৃহত্তম চামড়ার মোকাম রাজারহাটের চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।”
তিনি আরও জানান, জেলার আট উপজেলায় নিবন্ধিত খামারের সংখ্যা ১৩ হাজার ৬৪০টি এবং গবাদিপশু চাষির সংখ্যা ১৪ হাজার ১৩৫ জন। খামারিদের সচেতন করতে নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও মতবিনিময় সভা করা হচ্ছে, যাতে ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার না করে প্রাকৃতিক উপায়ে পশু মোটাতাজা করা হয়।
তবে খামারিরা বলছেন, গরু মোটাতাজাকরণে হরমোন ব্যবহারের অভিযোগ বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। অধিকাংশ খামারেই এখন প্রাকৃতিক খাদ্য ব্যবহার করে পশু লালন-পালন করা হচ্ছে।
যশোর সদর উপজেলার রামনগর ইউনিয়নের শাহাবাটি গ্রামের খামারি আব্দুর রউফ বলেন, “আমার খামারে এখন ৩৬টি উন্নত জাতের ষাঁড় রয়েছে। প্রতিটির ওজন ৫০০ থেকে ৭০০ কেজির মধ্যে হবে। সবুজ ঘাস, ভুট্টা ও গমের ভুসি খাইয়ে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে গরু মোটাতাজা করা হয়েছে।”
গত বছরের বাজার পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “শেষ সময়ে এসে ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা কেজি দরে কয়েকটি গরু বিক্রি করতে হয়েছিল। এতে অনেক লোকসান হয়েছে। হাটে ক্রেতা কম ছিল, আবার কিছু ব্যবসায়ী বাজার নিয়ন্ত্রণ করেছে বলেও অভিযোগ ছিল। এবার ভালো দাম পাব কি না, তা নিয়ে এখনও দুশ্চিন্তায় আছি।”
একই উপজেলার কিসমত নওয়াপাড়া গ্রামের খামারি সাইফুল ইসলাম বলেন, “এবার ২০টি গরু প্রস্তুত করেছি। কয়েক মাস ধরে পরিচর্যা চলছে। কিন্তু গত বছর অনেক খামারি শেষ সময়ে বিপদে পড়েছিলেন। অনেক গরু অবিক্রিত থেকেছে, কেউ কেউ বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি করেছেন।”
তিনি আরও বলেন, “বাজারে এক ধরনের অস্থিরতা ছিল। ছোট খামারিরা ন্যায্যমূল্য পায়নি। এবার সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থাপনা না হলে ক্ষুদ্র খামারিদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে যাবে।”
খামারিরা জানান, গত কয়েক বছরে পশুখাদ্য, খড়, ভুসি, ভুট্টা ও ওষুধের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। পাশাপাশি পরিবহন ব্যয়ও বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে উৎপাদন খরচ বাড়লেও বাজারে সেই অনুপাতে দাম পাওয়া যাচ্ছে না।
এদিকে কুরবানির পশুর হাটগুলোতে নিরাপত্তা ও তদারকি জোরদারের কথা জানিয়েছে প্রশাসন। জেলা পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম বলেন, “প্রতিটি পশুর হাটে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। ক্রেতা ও বিক্রেতারা যাতে নির্বিঘ্নে কেনাবেচা করতে পারেন, সে বিষয়ে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজনে অস্থায়ী হাট বসানোর বিষয়েও চিন্তা করা হচ্ছে।”
প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা সিদ্দিকুর রহমান বলেন, জেলার প্রতিটি হাটে ভেটেরিনারি টিম কাজ করবে। কোনো অসুস্থ পশু, পেটে বাচ্চাযুক্ত গাভী বা অস্বাস্থ্যকর উপায়ে মোটাতাজাকরণ করা পশু যাতে বাজারে বিক্রি না হয়, সে বিষয়ে কঠোর নজরদারি থাকবে।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মেহেদী হাসান
কার্যালয়ঃ দেশ ভিলা, বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মিয়া সড়ক, জিটি স্কুল সংলগ্ন, টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ।
মোবাইলঃ ০১৭১৮-৫৬৫১৫৬, ০১৯৯৫-৩৮৩২৫৫
ইমেইলঃ mehadi.news@gmail.com
Copyright © 2026 Nabadhara. All rights reserved.