নিজস্ব প্রতিবেদক, গাজীপুর
ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (ডুয়েট), গাজীপুরে নতুন উপাচার্য (ভিসি) নিয়োগকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ ঘোষণা করেছেন। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে টানা ব্লকেড কর্মসূচি পালন করছেন তারা। ফলে শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।
টানা আন্দোলন, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, সংঘর্ষ, মামলা ও রাজনৈতিক উত্তেজনায় পুরো ক্যাম্পাসে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
সরকার সম্প্রতি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইকবালকে ডুয়েটের নতুন ভিসি হিসেবে নিয়োগ দেয়। নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারির পর থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের একটি অংশ এ সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করে আন্দোলনে নামে। তাদের দাবি, ডুয়েটের অভ্যন্তরীণ জ্যেষ্ঠ ও যোগ্য শিক্ষকদের মধ্য থেকেই ভিসি নিয়োগ দিতে হবে।
গত কয়েকদিন ধরে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল, মানববন্ধন, অবস্থান কর্মসূচি, সড়ক অবরোধ, ‘লাল কার্ড’ প্রদর্শন এবং ব্লকেড কর্মসূচি পালন করে আসছেন। মঙ্গলবার সকাল থেকেই শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থান নেন এবং ‘ডুয়েট থেকে ভিসি চাই’, ‘বহিরাগত ভিসি মানি না’, ‘ডুয়েটের স্বার্থে অভ্যন্তরীণ নেতৃত্ব চাই’সহ বিভিন্ন স্লোগানে ক্যাম্পাস মুখর করে তোলেন।
দুপুরের পর ক্যাম্পাসে খবর ছড়িয়ে পড়ে যে নবনিযুক্ত ভিসি গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ ও ডুয়েট ছাত্রদলকে সঙ্গে নিয়ে ক্যাম্পাসে প্রবেশের চেষ্টা করতে পারেন। এ খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সাধারণ শিক্ষার্থীরা প্রধান ফটকে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ আরও জোরদার করেন। একপর্যায়ে শিক্ষার্থীরা গেটের ভেতরে কাঠ, পানির ট্যাংক ও বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা স্থাপন করে অবস্থান নেন।
পরে বিকেল ৩টার দিকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ ঘোষণা করা হয় এবং প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক কার্যক্রম কার্যত অচল হয়ে পড়ে।
আন্দোলনকারীরা জানান, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তাদের কর্মসূচি চলবে। তারা নতুন ভিসির নিয়োগ বাতিল করে ডুয়েটের অভ্যন্তরীণ শিক্ষককে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার দাবি জানান।
পরে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পুরকৌশল বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী আমান উল্লাহ ও হাসানুর রহমান বক্তব্য দেন। তারা বলেন, “গণতান্ত্রিক দাবিকে যেভাবে সংঘাতে রূপ দিয়ে শিক্ষার্থীদের রক্তাক্ত করা হয়েছে, সেই দাবি থেকে আমরা পিছপা হব না। বাইরের ভিসি নিয়োগের প্রজ্ঞাপন বাতিল করতে হবে।”
শিক্ষার্থীরা দাবি করেন, তাদের আন্দোলন সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত কর্মসূচি। তাদের ভাষ্য, ডুয়েট একটি বিশেষায়িত প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ায় এখানকার শিক্ষা, গবেষণা ও প্রশাসনিক বাস্তবতা সম্পর্কে অভ্যন্তরীণ শিক্ষকদের অভিজ্ঞতা বেশি। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার স্বার্থে অভ্যন্তরীণ শিক্ষক থেকেই ভিসি নিয়োগ প্রয়োজন।
সাধারণ শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে তিন দফা দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিগুলো হলো— অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইকবালের ভিসি নিয়োগ বাতিল, ডুয়েটের নিজস্ব শিক্ষককে ভিসি হিসেবে নিয়োগ এবং রোববারের সংঘর্ষে জড়িতদের বিচার নিশ্চিত করা। পাশাপাশি আহত শিক্ষার্থীদের সুচিকিৎসা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিও জানানো হয়।
শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, গত রোববার শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচির সময় ছাত্রদল ও বহিরাগতদের নিয়ে হামলা চালানো হয়। তাদের দাবি, গেট ভেঙে বাইরে থেকে ইটপাটকেল ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলা করা হয়। এতে অন্তত ১৮ জন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ১২ জন গুরুতর আহত। তবে এসব অভিযোগের স্বতন্ত্র সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি কার্যালয়ের কনফারেন্স রুমে শিক্ষক সমিতির পক্ষ থেকেও পৃথক সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. খসরু মিয়া ও সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. কাজী রফিকুল ইসলাম স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে চলমান পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।
অধ্যাপক ড. মো. খসরু মিয়া বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি নিয়োগে অভ্যন্তরীণ শিক্ষককে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়ে শিক্ষক সমাজের রেজোলিউশন রয়েছে। তবে সরকার যাঁকে নিয়োগ দিয়েছে, তাঁকে অমান্য করাও সম্ভব নয়।
শিক্ষক নেতারা বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞানচর্চা ও গণতান্ত্রিক মতপ্রকাশের স্থান। শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের অধিকার যেমন রয়েছে, তেমনি সহিংসতা ও বহিরাগত হস্তক্ষেপ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।”
তারা রোববারের ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, হামলাকারীদের শনাক্তকরণ এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।
অন্যদিকে সোমবার বিকেলে ডুয়েট ছাত্রদলের পক্ষ থেকেও ক্যাম্পাসের বাইরে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে শাখা ছাত্রদলের সভাপতি জামিরুল ইসলাম জামিল, সিনিয়র সহ-সভাপতি রুকন আলী, সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কাদির ও যুগ্ম সম্পাদক রাকিবুল ইসলামসহ অন্যান্য নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
তারা বলেন, সরকার যেহেতু নতুন ভিসি নিয়োগ দিয়েছে, তাই তারা তাকে স্বাগত জানাচ্ছেন। তবে সরকার ডুয়েটের কোনো শিক্ষককে ভিসি হিসেবে নিয়োগ দিলেও তাদের আপত্তি থাকবে না।
ছাত্রদল নেতারা অভিযোগ করেন, সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের আড়ালে ইসলামী ছাত্রশিবির ও জাতীয় ছাত্রশক্তির কিছু কর্মী সক্রিয়ভাবে পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। যদিও এসব অভিযোগেরও স্বতন্ত্র সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এর আগে গত রোববার দিনভর শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপে ডুয়েট ক্যাম্পাস কার্যত রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, সংঘর্ষে অন্তত ২০ শিক্ষার্থী আহত হন। আহত হন কয়েকজন পুলিশ সদস্যও। গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, আহতদের হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
এ ঘটনায় গাজীপুর সদর মেট্রো থানায় একটি মামলা দায়ের করেছে পুলিশ। মামলায় সরকারি কাজে বাধা, হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগে অজ্ঞাতনামা ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তারের তথ্য পাওয়া যায়নি।
গাজীপুর সদর মেট্রো থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে অবস্থান নিয়ে ব্লকেড কর্মসূচি পালন করছেন। তাদের অবস্থানের কারণে পুলিশ ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেনি। তবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
এদিকে একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, পার্শ্ববর্তী ইউএনও অফিসে যোগদানপত্রে স্বাক্ষর করার পর নবনিযুক্ত ভিসি মঙ্গলবারও ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেননি। বিষয়টি নিয়েও শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে নানা আলোচনা চলছে। তবে এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা পর্যন্ত আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা ব্লকেড ও শাটডাউন কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছিলেন। ক্যাম্পাসজুড়ে তখনও উত্তেজনা ও অনিশ্চয়তা বিরাজ করছিল।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মেহেদী হাসান
কার্যালয়ঃ দেশ ভিলা, বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মিয়া সড়ক, জিটি স্কুল সংলগ্ন, টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ।
মোবাইলঃ ০১৭১৮-৫৬৫১৫৬, ০১৯৯৫-৩৮৩২৫৫
ইমেইলঃ mehadi.news@gmail.com
Copyright © 2026 Nabadhara. All rights reserved.