সাইফুল ইসলাম, বাবুগঞ্জ (বরিশাল) প্রতিনিধি
সারা দেশের মতো বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলায় তীব্র বিদ্যুৎ সংকট দেখা দিয়েছে। গরমের শুরুতেই ঘন ঘন লোডশেডিং এবং দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকায় জনজীবন চরম দুর্ভোগে পড়েছে। এতে স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি ও উৎপাদনমুখী শিল্পখাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং স্থানীয় অর্থনীতি ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
উপজেলার স্বাস্থ্যখাতে বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বাবুগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ ছয়টি ইউনিয়নের কমিউনিটি ক্লিনিকে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে নিয়মিত চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। জরুরি সেবাদানেও প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে, যা রোগীদের জন্য বাড়তি ঝুঁকি সৃষ্টি করছে।
বাবুগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মোঃ মনিরুল ইসলাম বলেন, ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং কমিউনিটি ক্লিনিকে নিয়মিত সেবা প্রদান ব্যাহত হচ্ছে। জরুরি চিকিৎসাসেবা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। অনেক গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে না, যা রোগীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি করছে। আমরা বিকল্প ব্যবস্থার মাধ্যমে সেবা চালু রাখার চেষ্টা করছি, তবে নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ অত্যন্ত জরুরি।
অন্যদিকে, চলতি বোরো মৌসুমের শেষ পর্যায়ে সেচ সংকটে পড়েছেন কৃষকরা। বিদ্যুৎ না থাকায় সেচ পাম্প চালানো সম্ভব হচ্ছে না, ফলে ধানের উৎপাদন নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বাবুগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোঃ আব্দুর রউফ জানান, উপজেলায় চলতি বোরো মৌসুমে ৩,৩৫০ হেক্টর জমিতে ধান আবাদ হয়েছে। দেশের চলমান জ্বালানি তেল সংকট থাকা সত্ত্বেও আমরা উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে প্রকৃত কৃষকদের তালিকা তৈরি করে ফিলিং স্টেশনগুলোতে প্রেরণ করেছি। এতে করে তালিকা অনুযায়ী কৃষকদের প্রয়োজনীয় ডিজেল সরবরাহ করা হচ্ছে।
শিল্প ও উৎপাদন খাতেও বিদ্যুৎ সংকট মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে। উপজেলার অমৃত কনজিউমার ফুড প্রোডাক্ট লিমিটেডসহ অন্যান্য উৎপাদনমুখী প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না থাকায় উৎপাদন কার্যক্রম স্থবির হয়ে গেছে। এতে উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি উদ্যোক্তারা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
অমৃত কনজিউমার ফুড প্রোডাক্ট লিমিটেডের এইচআর ম্যানেজার গোকুল মজুমদার জানান, বিদ্যুৎ সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ না থাকায় প্রতিষ্ঠানকে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে।
বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার দায়িত্বে থাকা বরিশাল পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ এর জেনারেল ম্যানেজার প্রকৌশলী বিপুল কৃষ্ণ মন্ডল বলেন, বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনও আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়। জাতীয় গ্রিড থেকে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ পাচ্ছি, সেই অনুযায়ী গ্রাহকদের মধ্যে বিতরণ করা হচ্ছে।
সাধারণ জনগণ অভিযোগ করেছেন, দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় দৈনন্দিন জীবনযাত্রা দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। তীব্র গরমে বিদ্যুৎহীন অবস্থায় বসবাস করা কষ্টসাধ্য, বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধদের জন্য।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, জ্বালানি তেলের ঘাটতি, গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। দ্রুত এই সংকট সমাধান না হলে শুধুমাত্র বাবুগঞ্জ নয়, সারাদেশের উৎপাদনমুখী খাত মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হবে এবং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ব্যাহত হবে।
এমতাবস্থায়, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন এলাকাবাসী। তারা দাবি করেছেন, নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করে স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি এবং শিল্পখাত সচল রাখা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

