মো:মোকাররম হোসাইন, জয়পুরহাট প্রতিনিধি
সকাল নয়টা পেরিয়ে গেছে। স্কুল শুরু হওয়ার সময় হলেও জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার সোনামুখী ইউনিয়নের পলাশবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আঙিনায় নেই সেই চিরচেনা কোলাহল। নেই শিশুদের দৌড়ঝাঁপ, হাসি কিংবা সমবেত প্রার্থনার শব্দ। একটি মাত্র কক্ষে কয়েকজন শিক্ষার্থী নীরবে বসে আছে, এটাই পুরো বিদ্যালয়ের সক্রিয় চিত্র।
এই চিত্রই যেন বলছে, বিদ্যালয়টি আছে কাগজে, নেই বাস্তবে। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যালয়টিতে মোট তিনটি কক্ষ থাকলেও শ্রেণিকক্ষ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে মাত্র একটি। সেই একটি কক্ষেই একসঙ্গে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির পাঠদান চলছে। একটি কক্ষ অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হলেও অন্যটি দীর্ঘদিন ধরে ফাকা পড়ে আছে। শিক্ষক সংকট আর শিক্ষার্থী স্বল্পতায় বিদ্যালয়টি কার্যত একটি কক্ষে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত এ বিদ্যালয়টি ২০১৩ সালে সরকারিকরণ করা হয়। বর্তমানে কাগজে-কলমে শিশু থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ১৯ জন শিক্ষার্থী তালিকাভুক্ত থাকলেও নিয়মিত আসে মাত্র পাঁচ থেকে সাতজন। অনেকেই ভর্তি থাকলেও স্কুলে আসে না। কেউ পড়ছে পাশের মাদ্রাসায়, কেউ আবার আশপাশের বড় স্কুল কিংবা শহরের কিন্ডারগার্টেনে। আবার কেউ সেই স্কুলে ভর্তি থেকেও অন্য স্কুলে ক্লাস করছে।
বিদ্যালয়টিতে প্রধান শিক্ষকসহ তিনজন শিক্ষক থাকলেও একজন বর্তমানে প্রশিক্ষণে থাকায় পাঠদান চালাতে হচ্ছে মাত্র দুইজন শিক্ষক দিয়ে। একাধিক শ্রেণির পাঠ একসঙ্গে পরিচালনা করায় পাঠের গভীরতা ও শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অভিভাবকরা।
স্থানীয়দের অভিভাবকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, নিয়মিত তদারকির অভাবে বিদ্যালয়ের এই দুরবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই চলেছে। বিদ্যালয়টির দুই কিলোমিটারের মধ্যে রয়েছে রামশালা ও জাফরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। তুলনামূলকভাবে ভালো পরিবেশ ও পাঠদানের কারণে অধিকাংশ অভিভাবক সন্তানদের সেখানে ভর্তি করাচ্ছেন। আর যারা আর্থিকভাবে সচ্ছল, তাঁরা সন্তানদের উপজেলার বিভিন্ন শহরের বিভিন্ন কিন্ডারগার্টেন স্কুলে পাঠাচ্ছেন। উপজেলা শিক্ষা অফিসের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কার্যকর নজরদারি না থাকায় সমস্যাগুলো জটিল আকার ধারণ করেছে। বিদ্যালয়টি আজ বিলিনের পথে।
পলাশবাড়ী গ্রামের অভিভাবক আনিছুর রহমান বলেন, ‘এই স্কুলে এখন পড়াশোনার মতো পরিবেশ নেই। সব ক্লাস এক রুমে চলে। তাছাড়া একজন অথর্ব প্রধান শিক্ষক দিয়ে স্কুলটি চলছে। তাই বাড়ির পাশে স্কুল থাকলেও সন্তানকে শহরের কিন্ডারগার্টেনে ভর্তি করেছি।’
আরেক অভিভাবক সেলিনা আক্তার বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ তৈরি করার মতো পরিবেশ এখানে নেই। সরকারি তদারকিও চোখে পড়ে না।’
বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সাবেক সহ-সভাপতি মতিউর রহমান বলেন, একসময় এই স্কুলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ভালোই ছিল। বর্তমানে শিক্ষকদের আচরণ, শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনা আর গ্রামের কিছু অভ্যন্তরীণ বিরোধের কারণে শিক্ষার্থী কমে গেছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে স্কুলটি আরও সংকটে পড়বে।
এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মনোয়ারা বেগম বলেন, গত তিন বছর ধরে শিক্ষার্থী কমছে। আমরা চেষ্টা করছি। তবে পাশে বড় স্কুল থাকায় সবাই সেখানে চলে যাচ্ছে। বিষয়টি আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ অবগত আছে।
এ বিষয় উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সিদ্দিকুর রহমান বলেন, বিদ্যালয়টির অবস্থা আমরা জানি। অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী তদারকি চলছে। প্রয়োজন হলে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিদ্যালয়ের দুরাবস্থা জানার পরেও কি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, গত বছরের শেষ দিকে অধিপ্তর থেকে প্রেরিত নির্দেশনা মোতাবেক আমরা কাজ করছি। এরপরও উন্নতি না হলে সরকারি নির্দেশনা মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

