ঝালকাঠি প্রতিনিধি
সদর উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়কালে ঝালকাঠি-২ আসনের সংসদ সদস্য ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টোর বক্তব্য ঘিরে জেলা বিএনপি ও স্থানীয় বিভিন্ন মহলে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কার্যক্রমে তার ‘রিপ্রেজেন্টেটিভ’ হিসেবে দুজনকে সমন্বয়ের দায়িত্ব দেওয়ার ঘোষণাকে ঘিরে শুরু হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা।
গত ২২ ফেব্রুয়ারি বেলা সাড়ে ১১টায় উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে আয়োজিত ওই সভায় তিনি বলেন, “এখানে এলিন এবং হুমায়ুন আমার রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে কাজ করবে। কোন সেক্টরে কী কী কাজ আছে, ওরা জানবে। ওরা আপনাদের সঙ্গে সবসময় যোগাযোগ রাখবে। ম্যাডামের (ইউএনও) সঙ্গেও যোগাযোগ রাখবে। কোন সময় কী অনুদান আসে, সে বিষয়েও খোঁজ রাখবে।
ঘটনার দিন কোনো গণমাধ্যমকর্মী উপস্থিত ছিলো না। গতকাল ১ মার্চ সভার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভাইরাল ভিডিওতে সংসদ সদস্যকে এলিন ও হুমায়ুনকে বিভিন্ন দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয়ের নির্দেশনা দিতে শোনা যায়। এরপর থেকেই স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গন ও নাগরিক মহলে এ নিয়ে আলোচনা তীব্র হয়।
সভায় তিনি আরও বলেন, এলাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তালিকা দিতে হবে। সমাজকল্যাণ খাতে কী কী সুযোগ-সুবিধা রয়েছে, তারও তালিকা চেয়েছেন তিনি। নতুন রাস্তাঘাটের কাজ শুরু হলে আগে থেকে জানাতে বলেন এবং ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের কথাও উল্লেখ করেন। সংসদ অধিবেশন শেষে প্যাডের কাগজ পাওয়া যাবে জানিয়ে সংশ্লিষ্টদের ডিও লেটার দেওয়ার আহ্বান জানান।
ভিজিএফ-ভিজিডি বিতরণে অতীতে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, “সরকার টাকার বিনিময়ে দেয়নি। প্রকৃত গরিবরা যেন সহায়তা পায়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।” এলিন ও হুমায়ুনকে উদ্দেশ করে তিনি আরও বলেন, “তোমরা যে লিস্ট দিবা, কার্ড দিবা, সেটা কিন্তু আমরা দেখবো। আমি ও ম্যাডাম (ইউএনও) যেকোনো মুহূর্তে চলে যাবো।
এ বিষয়ে শহর যুবদলের কর্মী আরিফুর রহমান বলেন, নির্দিষ্ট কয়েকজনকে দায়িত্ব দিলে স্বচ্ছতা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তিনি দাবি করেন, উন্নয়ন ও সহায়তা কার্যক্রমে দলীয় প্রভাবমুক্ত, উন্মুক্ত ও জবাবদিহিমূলক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা জরুরি। তা না হলে তৃণমূল পর্যায়ে অসন্তোষ তৈরি হতে পারে এবং অনিয়মের সুযোগ বাড়ে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এলজিইডির সিনিয়র প্রকৌশলী শিপলু কর্মকার বলেন, বিভিন্ন সময় কাজ গ্রহণের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে চাপ সৃষ্টি করা হয়। এতে টেন্ডার প্রক্রিয়া ও কারিগরি মূল্যায়ন বাধাগ্রস্ত হয়। তিনি বলেন, উন্নয়ন কাজের মান ও সময়সীমা ঠিক রাখতে হলে বিধি-বিধান মেনে স্বচ্ছ পদ্ধতিতে কাজ বণ্টন হওয়া প্রয়োজন। প্রশাসন সবসময় নিয়ম অনুযায়ী কাজ করতে চায় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সাংসদ ইলেন ভুট্টোর বক্তব্যের বিষয়ে তাকে সরাসরি পাওয়া না গেলে তার পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফোরামের লাইব্রেরি সম্পাদক ও সাংসদের দেবর অ্যাডভোকেট নাজমুল হক লাবলু বলেন, কাউকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে কোনো মন্তব্য করা হয়নি। উন্নয়ন কার্যক্রমে সমন্বয় বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে মাত্র। প্রতিটি দপ্তর তাদের নিজস্ব নীতিমালা ও সরকারি বিধি অনুযায়ী কাজ করবে, সেখানে অযাচিত হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই বলেও তিনি জানান।
সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সেগুফতা মেহনাজ বলেন, একজন সংসদ সদস্য আইনপ্রণেতা এবং জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে এলাকার উন্নয়ন নিয়ে কাজ করবেন, আমরা সহযোগিতা করবো। তার কোন বক্তব্য তার ব্যক্তিগত ও দলীয় বিষয়। উপজেলা প্রশাসন আইন ও বিধিমালা অনুসরণ করে দায়িত্ব পালন করবে এবং সকলের সহযোগিতায় এলাকার উন্নয়ন কার্যক্রম এগিয়ে নেবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
জেলা বিএনপির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট শাহাদাত হোসেন বলেন, নির্বাচনের আগে তিনিসহ আরও কয়েকজন মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন, তবে দল থেকে ইলেন ভুট্টোকে মনোনয়ন দেওয়া হয় এবং তিনি নির্বাচিত হন। একজন সংসদ সদস্য গুরুত্বপূর্ণ ও দায়িত্বশীল পদে থেকে এ ধরনের বক্তব্য দেওয়া উচিত নয় এবং তারা এটি সমর্থন করেন না। তিনি বলেন, উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সমন্বয় করা যেতে পারে, কিন্তু প্রশাসনিক কার্যক্রমে নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে প্রতিনিধিত্ব দেওয়ার ঘোষণা বিভ্রান্তিকর। যা জনমনে বেশ প্রশ্ন তুলছে। সরকারি দপ্তরগুলোকে বিধি-বিধান অনুযায়ী পরিচালিত হতে হবে এবং উন্নয়ন ও অনুদান কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি, খবরদারি নয়।
উল্লেখ্য, এই ঘটনার পর সংসদ সদস্য তার ফেসবুক পোস্টে জানিয়েছেন তার পিএস বা এপিএস পরিচয় দিয়ে কেউ অনৈতিক সুবিধা চাইলে তাৎক্ষণিকভাবে তাকে জানাতে এবং কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন না করতে। তিনি স্পষ্ট করেন, কাউকে পিএস বা এপিএস হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়নি এবং অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হওয়ার আহ্বান জানান।

