সুজন চোধুরী, বান্দরবান
টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে বান্দরবান। পাহাড়ধস ও সড়কের ওপর পানি উঠে যাওয়ায় চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের সঙ্গে বান্দরবানের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। জেলার বিভিন্ন এলাকায় যান চলাচল বন্ধ থাকায় দূরপাল্লার যাত্রী ও স্থানীয় বাসিন্দারা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।
টানা চার দিনের ভারী বৃষ্টিতে জেলার বিভিন্ন স্থানে ছোট-বড় পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। এরই মধ্যে লামা উপজেলার আজিজনগর এলাকায় পাহাড়ধসে একই পরিবারের পাঁচজন নিহত হন। অব্যাহত বৃষ্টিতে কোথাও সড়কের ওপর মাটি ও গাছ পড়ে রয়েছে, আবার কোথাও পাহাড়ি ঢলের পানিতে সড়ক তলিয়ে গেছে।
সড়ক যোগাযোগ বন্ধ থাকায় বিভিন্ন স্থানে যাত্রীবাহী বাস, ট্রাক ও পণ্যবাহী যানবাহন আটকা পড়েছে। অনেক যাত্রী বিকল্প পথে গন্তব্যে যাওয়ার চেষ্টা করছেন, আবার কেউ মাঝপথে অপেক্ষা করতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে জরুরি প্রয়োজনে চলাচলকারী মানুষও বিপাকে পড়েছেন।
বর্ষার প্রভাব পড়েছে স্থানীয় বাজারেও। কাঁচা সবজি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় অনেক এলাকায় সংকট দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এ সুযোগে বাজারে বিভিন্ন পণ্যের দামও বেড়ে গেছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় সকাল ৬টা পর্যন্ত বান্দরবানে ১৩১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। গত পাঁচ দিনে মোট বৃষ্টিপাত হয়েছে ৮৯১ মিলিমিটার। সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি কিছুটা কমলেও এখনো বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় আরও ৪৪ থেকে ৮৮ মিলিমিটার পর্যন্ত মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনার কথাও জানিয়েছে সংস্থাটি।
জেলা শহরের বনরূপা, কালাঘাটা, বড়ুয়াটেকসহ বিভিন্ন এলাকায় এবং উপজেলার পাহাড় কেটে গড়ে ওঠা ঝুঁকিপূর্ণ বসতিগুলোতে বসবাসকারী মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। পাহাড়ধসের আশঙ্কায় জেলা প্রশাসন পাহাড়ের পাদদেশ ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিচ্ছে। এ কাজে প্রশাসনের পাশাপাশি সেনাবাহিনী, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও অংশ নিয়েছেন।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, দুর্যোগ মোকাবিলায় জেলায় ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। সেখানে পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। আশ্রয়কেন্দ্রে খাবার ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহ করা হলেও কিছু এলাকায় এখনো ত্রাণ না পৌঁছানোর অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে জেলা শহরের আর্মিপাড়া, শেরেবাংলা নগর, বালাঘাটা, লেমুঝিড়ি, গোয়ালিয়াখোলাসহ বিভিন্ন এলাকায় এখনো কয়েক হাজার মানুষের বাড়িঘর পানির নিচে রয়েছে। তবে সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি কমতে শুরু করায় অনেক এলাকায় ধীরে ধীরে পানি নামছে।
উজানীপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা রনি বড়ুয়া ও সাগরিকা জানান, বন্যায় বাড়িঘর ডুবে যাওয়ায় পরিবার নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে উঠেছেন। কিন্তু সেখানে টয়লেট অপরিষ্কার, মশা-মাছির উপদ্রব এবং গাদাগাদি করে থাকার কারণে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। এছাড়া সড়ক ডুবে যাওয়া ও পাহাড়ধসের কারণে যাতায়াতেও নানা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন তারা।
জেলা প্রশাসক সানিউল ফেরদৌস বলেন, দুর্যোগ মোকাবিলায় ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্র চালু করা হয়েছে। পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে নিয়মিত মাইকিং করা হচ্ছে। তিনি জানান, আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা মানুষের জন্য খাবার ও প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে এবং সব সংস্থার সমন্বয়ে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

