যশোর প্রতিনিধি
যশোরের মণিরামপুর উপজেলার খেদাপাড়ায় অবস্থিত সবুজ পল্লী কলেজে এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় শূন্য পাস হয়েছে। সাতজন পরীক্ষার্থীর কেউই পাস করতে পারেননি। শিক্ষক সংকট, বিশেষ করে ইংরেজি শিক্ষকের অনুপস্থিতি এবং দীর্ঘদিন ধরে এমপিওভুক্ত না হওয়াকে এর মূল কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মণিরামপুর-খেদাপাড়া রোডের পাশে ধানখেতের মধ্যে ছোট দুটি কাঁচাপাকা ভবনে দাঁড়িয়ে আছে কলেজটি। একটি ভবনের পলেস্তারা খসে পড়েছে। শিক্ষক-কর্মচারীরা কখনও বেতন পাননি। ইংরেজির একমাত্র প্রভাষক এস আলম ২০২৫ সালে মারা যাওয়ার পর আর কোনো শিক্ষক আসেননি। এমপিওভুক্ত না হওয়ায় নতুন শিক্ষক নিয়োগও হয়নি।
২০০৩ সালে খেদাপাড়া ইউনিয়নের তৎকালীন চেয়ারম্যান জিএম ওমর ফারুকের উদ্যোগে কলেজটি প্রতিষ্ঠিত হয়। মানবিক, বিজ্ঞান ও বাণিজ্য বিভাগে পাঠদানের অনুমোদন মেলে। শুরুতে ১৫ জন শিক্ষক ছিলেন। বেতন-ভাতা না পাওয়ায় বিজ্ঞান ও বাণিজ্য বিভাগের শিক্ষকরা ধীরে ধীরে চলে যান। একপর্যায়ে শিক্ষার্থীও কমে যায়। পরে মানবিক বিভাগের কয়েকজন প্রভাষক ক্লাস নিতেন। ২০২৫ সালের ৪ মার্চ ইংরেজির প্রভাষক এস আলমের মৃত্যুর পর পরিস্থিতি আরও সংকটময় হয়ে ওঠে।
ফলাফলের চিত্রও বছর বছর খারাপের দিকে গেছে। ২০২২ সালে ৩৬ জন পরীক্ষা দিয়ে ২৯ জন পাস করেন। ২০২৩ সালে ২৭ জনের মধ্যে ২৬ জন, ২০২৪ সালে ১০ জনের মধ্যে ৮ জন এবং ২০২৫ সালে ৫ জনের মধ্যে ৩ জন পাস করেন। এবার সাতজন পরীক্ষা দিয়ে কেউ পাস করেননি। তিনজন এক বিষয়ে এবং দুইজন দুই বিষয়ে ফেল করেছেন।
কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম হোসেন বলেন, ‘২৩ বছর ধরে কলেজে শিক্ষকতা করছি। এক পয়সাও পাইনি। ছেলেমেয়ে, ঘর-সংসার তো রয়েছে। একাদশ শ্রেণিতে ৩১ জন এবং দ্বাদশ শ্রেণিতে ৪১ জন শিক্ষার্থী আছে। তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে এখনও টিকে আছি।’ তিনি দাবি করেন, এমপিওর শর্ত পূরণ করা সত্ত্বেও রাজনৈতিক কারণে কলেজটি এমপিওভুক্ত হতে পারেনি। প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান বিএনপির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাধা দেওয়া হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
কলেজের অধ্যক্ষ রেজাউল ইসলাম বলেন, ‘অন্যান্য বছর ফলাফল সন্তোষজনক থাকলেও এবার কেউ পাস করেনি। ইংরেজি প্রভাষক না থাকার কারণে এ বিপর্যয় ঘটেছে। একজন খণ্ডকালীন শিক্ষক দিয়ে ক্লাস করানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। বেতন না পাওয়ায় তিনি মাস দুয়েক পর আর আসেননি।’
স্থানীয়রা বলছেন, ২০০৬ সালের পর কাছাকাছি ‘মাতৃভাষা কলেজ’ নামে আরেকটি প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে এবং তা দ্রুত এমপিওভুক্ত হয়। অথচ আগে প্রতিষ্ঠিত সবুজ পল্লী কলেজ বঞ্চিত হয়। খেদাপাড়া বাজারের এক ব্যবসায়ী বলেন, শিক্ষক না থাকায় শিক্ষার্থীরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।
কলেজ পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি কবীর হোসেন বলেন, ‘প্রতিষ্ঠার পর এবারই প্রথম পাসের হার শূন্য। ইংরেজি শিক্ষক থাকলে এ অবস্থা হতো না। আগামীতে যাতে এমন না হয়, তার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’
যশোর শিক্ষাবোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর এস এম হোসেন আলী বলেন, শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বোর্ড কঠোর অবস্থানে আছে। কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। তবে স্বীকৃতি নবায়ন না করার বিষয়ে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি বলে তিনি জানান।
খেদাপাড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল আলিম জিন্না বলেন, ‘কলেজটি অত্যন্ত দুরবস্থায় আছে। এমপিওভুক্ত হলে এলাকার শিক্ষার্থীদের স্বার্থে প্রতিষ্ঠানটি প্রাণ ফিরে পাবে।’

