মোঃ ইব্রাহীম মিঞা, দিনাজপুর প্রতিনিধি
নির্বাচনী প্রচারণা জমে উঠলেও দিনাজপুর–৬ আসনের অধিকাংশ ছাপাখানায় নেই আগের মতো কর্মচাঞ্চল্য। কারণ, এবারই প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচনী আচরণবিধি অনুযায়ী পোস্টার ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ফলে প্রচারের ধরনেও এসেছে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন।
পোস্টারের পরিবর্তে প্রার্থীরা এখন ব্যানার, ডিজিটাল ব্যানার, লিফলেট, হ্যান্ডবিল, স্টিকার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে প্রচারের প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছেন। এতে একদিকে যেমন মুদ্রণশিল্পের একটি বড় অংশ ক্ষতির মুখে পড়েছে, অন্যদিকে পরিবেশ রক্ষার ক্ষেত্রে এটিকে একটি ইতিবাচক ও সময়োপযোগী উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন অনেকে।
শনিবার (৩১ জানুয়ারি) দিনাজপুর–৬ আসনের বিরামপুর পৌরশহরের বিভিন্ন ছাপাখানা ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানেই নেই আগের মতো ব্যস্ততা। মুদ্রণশিল্পসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অতীতে নির্বাচনের সময় পোস্টার ছাপানোর চাপেই দিন-রাত কাজ চলত এসব ছাপাখানায়। কিন্তু এবার পোস্টার নিষিদ্ধ থাকায় সেই চিত্র পুরোপুরি পাল্টে গেছে। একই অবস্থা জেলার অন্যান্য উপজেলার ছাপাখানাগুলোতেও বিরাজ করছে।
ফ্রেন্ডস অফসেট প্রেসের স্বত্বাধিকারী প্রোঃ মোঃ আলাল বলেন, “নির্বাচনের সময় পোস্টার ছিল আমাদের আয়ের প্রধান উৎস। এবার হঠাৎ নিষেধাজ্ঞায় আমরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছি।”
রূপরেখা ডিজিটাল প্রিন্ট অ্যান্ড অফসেট প্রেসের প্রোঃ মোঃ সেকেন্দার আলী জানান, “সরকারের সিদ্ধান্ত পরিবেশের জন্য ভালো হলেও সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সারা দেশের মুদ্রণশিল্পের বিষয়টি আরও গুরুত্ব দিয়ে ভাবা দরকার ছিল।”
যুগবাণী অফসেট প্রেসের প্রোঃ আঃ হান্নান মন্ডল বলেন, একে তো প্রেসে কাজ নেই ওপর দিক দিয়ে আবার বিদ্যুৎ এর সমস্যা। সরকার বাহাদুরের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন যেন মুদ্রণশিল্প ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেদিকটাও ভেবে দেখার।
এছাড়াও আরিফ অফসেট ও উজ্জ্বল অফসেটসহ একাধিক ছাপাখানার মালিকরা একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।তাদের মতে, প্রচারের পোস্টার ব্যবহার নিষিদ্ধ থাকায় তারা সরাসরি আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন।
অন্যদিকে এই সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়েছেন অনেকেই। তাদের মতে, অতীতে পোস্টার পলিথিন দিয়ে সড়কের পাশে, দেয়াল, গাছ ও বৈদ্যুতিক খুঁটিতে টাঙানোর ফলে ব্যাপক দৃষ্টিদূষণ ও পরিবেশ দূষণ সৃষ্টি হতো। নির্বাচনের পর এসব পোস্টার অপসারণ না হওয়ায় শহরজুড়ে বর্জ্যের স্তূপ দেখা যেত। পোস্টার নিষিদ্ধ থাকায় এবার সেই ঝুঁকি অনেকটাই কমবে বলে তারা আশা করছেন।
তবে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মনির্ভর প্রচারণা নতুন সম্ভাবনার পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জও তৈরি করেছে। অনেক প্রার্থী ও ভোটারের কাছে এখনো স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট সুবিধা সীমিত থাকায় সমান প্রচারের সুযোগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের বয়স্ক ভোটারদের কাছে ডিজিটাল প্রচার কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়েও আলোচনা চলছে।
নির্বাচন কমিশনের এই উদ্যোগকে শৃঙ্খলাপূর্ণ ও পরিবেশবান্ধব নির্বাচন আয়োজনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে একই সঙ্গে মুদ্রণশিল্পসহ ক্ষতিগ্রস্ত খাতগুলোর জন্য বিকল্প ব্যবস্থা, পুনর্বাসন বা সহায়তার বিষয়েও নীতিনির্ধারকদের গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
উল্লেখ্য, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। পোস্টারবিহীন এই নির্বাচন পরিবেশ সুরক্ষায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখলেও, এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে ভবিষ্যতে আরও সমন্বিত ও ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন।

