জাতীয় বাজেট কোনো দেশের আয়-ব্যয়ের হিসাবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক দর্শন, উন্নয়ন কৌশল এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটও এমন এক সময়ে প্রণীত হয়েছে, যখন বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক ঋণের চাপ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির মতো গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। ফলে এই বাজেট শুধু আর্থিক পরিকল্পনা নয়, বরং অর্থনীতিকে স্থিতিশীল ও টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেওয়ার একটি নীতিগত উদ্যোগ।
বাজেটের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি। শিল্প, কৃষি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা (এসএমই) এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। একই সঙ্গে রপ্তানি বহুমুখীকরণ, দেশীয় শিল্পের বিকাশ এবং উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী ও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলতে সহায়ক হবে।
দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ অপরিহার্য। দক্ষ ও সুস্থ মানবসম্পদ ছাড়া টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব নয়। তাই কর্মমুখী শিক্ষা, কারিগরি ও প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ, গবেষণা এবং আধুনিক স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগ ভবিষ্যৎ উন্নয়নের ভিত্তি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে তরুণদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা সবচেয়ে বড় জাতীয় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। সরকারি চাকরির পাশাপাশি উদ্যোক্তা তৈরির পরিবেশ সৃষ্টি, স্টার্টআপে সহায়তা, ফ্রিল্যান্সিং এবং ডিজিটাল অর্থনীতির প্রসার ঘটানো গেলে বিপুলসংখ্যক তরুণের জন্য নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরি হবে। একই সঙ্গে বিদেশি ভাষা শিক্ষা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান আরও সুদৃঢ় করা সম্ভব।
তবে যেকোনো বাজেটের সফলতা নির্ভর করে তার কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর। স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে দক্ষতা নিশ্চিত না হলে বাজেটের কাঙ্ক্ষিত সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে না। পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বাজার ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বজায় রাখাও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
সব মিলিয়ে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট বাংলাদেশের অর্থনীতিকে নতুন ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে। তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে প্রয়োজন সুশাসন, দক্ষ বাস্তবায়ন এবং জাতীয় স্বার্থে সরকার, বেসরকারি খাত ও নাগরিক সমাজের সমন্বিত উদ্যোগ। পরিকল্পনার সফল বাস্তবায়নই নির্ধারণ করবে এই বাজেট ভবিষ্যতে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার কতটা শক্তিশালী ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।
লেখক:
মাহিন মেহেরাব অনিক
অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
অ্যাসিস্ট্যান্ট পাবলিক প্রসিকিউটর
বিজ্ঞ যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ, ১ম আদালত, বরগুনা
লেখক ও বিশ্লেষক

