রাসেল আহমেদ, খুলনা প্রতিনিধি
খুলনার মিয়াপাড়া এলাকায় ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার যুবদলের বহিষ্কৃত সদস্য নাসির উদ্দিন সেন্টুকে ঘিরে নানা প্রশ্ন ও আলোচনা তৈরি হয়েছে। তাকে গ্রেপ্তারের পর মাদক কারবারের অভিযোগের পাশাপাশি তার রাজনৈতিক পরিচয়, কথিত ওয়াকিটকি ব্যবহার, অপরাধজগতের সঙ্গে যোগাযোগ এবং হঠাৎ অর্থনৈতিক উত্থান নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার দাবি, সেন্টুর চলাফেরা ছিল অনেকটাই স্বাভাবিক। বাইরে থেকে তাকে দেখে মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত বলে বোঝার উপায় ছিল না। তবে আড়ালে তার কর্মকাণ্ড নিয়ে এলাকায় নানা গুঞ্জন রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা শুরু হওয়ার আগেই অনেক সময় সেন্টু খবর পেয়ে যেতেন। এ কাজে তিনি একটি উন্নত মানের ওয়াকিটকি ব্যবহার করতেন বলেও দাবি তাদের। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে এখনো এমন কোনো তথ্য নিশ্চিত করা হয়নি যে, ওই ওয়াকিটকি ব্যবহার করেই তিনি পুলিশের অভিযানের খবর পেতেন।
স্থানীয়দের বর্ণনা অনুযায়ী, সেন্টুকে মাঝেমধ্যে কালো রঙের অ্যান্টেনাযুক্ত একটি যন্ত্র হাতে দেখা যেত। সেটি দিয়ে তিনি কারও সঙ্গে কথা বলতেন। তবে কার সঙ্গে বা কী বিষয়ে কথা বলতেন, তা জানতেন না কেউ। তার গ্রেপ্তারের পর কথিত ওই ওয়াকিটকি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
তবে শনিবার সকালে র্যাবের অভিযানে সেন্টুকে গ্রেপ্তারের সময় তার কাছ থেকে কোনো ওয়াকিটকি পাওয়া যায়নি। ফলে যন্ত্রটি কোথায় গেল কিংবা সেটি আদৌ কী কাজে ব্যবহার করা হতো—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
খুলনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ওয়াকিটকি ব্যবহারের জন্য সরকারি অনুমোদনের প্রয়োজন রয়েছে। সেন্টুর হাতে ওয়াকিটকি থাকা একটি ছবি পাওয়া গেলেও সেটির সঙ্গে পুলিশের ব্যবহৃত ওয়াকিটকির কোনো মিল নেই। র্যাব সেন্টুকে কিছু টাকা, মাদক ও তিনজন নারীসহ থানায় সোপর্দ করেছে। কোনো ওয়াকিটকি সেট থানায় দেওয়া হয়নি।
তিনি আরও বলেন, অনুমোদন ছাড়া কেউ ওয়াকিটকি ব্যবহার করে থাকলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ওই যন্ত্র ব্যবহার করে কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়েছে কি না, তদন্তে তা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গত শনিবার সকাল পৌনে ৯টার দিকে মিয়াপাড়া এলাকায় বিএনপির সাবেক নেতা রিয়াজের বাড়ির চারতলা ভবনের নিচতলা থেকে নাসির উদ্দিন সেন্টুকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। অভিযানে তার কাছ থেকে ৩ হাজার ৯৫৮ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় সেন্টুর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
সেন্টু গ্রেপ্তারের পর তার সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে স্থানীয়ভাবে পরিচিত কয়েকজনের গা-ঢাকা দেওয়ার কথাও জানা গেছে। এতে মাদক কারবারের সঙ্গে আর কারা জড়িত এবং কর্মকাণ্ডের পরিধি কতটা বিস্তৃত ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সেন্টুর রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও এলাকায় আলোচনা রয়েছে। তিনি যুবদলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং পরে বহিষ্কৃত হন। স্থানীয় পর্যায়ে কেউ কেউ দাবি করছেন, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি বিএনপির মিডিয়া-সংক্রান্ত দায়িত্বেও তিনি যুক্ত ছিলেন। তবে দলের আনুষ্ঠানিক কোনো পদ বা দায়িত্বে তিনি ছিলেন কি না, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে নিশ্চিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে সেন্টুর আর্থিক উত্থান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। তাদের ভাষ্য, একসময় সাধারণ জীবনযাপন করা একজন ব্যক্তি কীভাবে অল্প সময়ে অর্থ-সম্পদের মালিক হলেন এবং তার আয়ের উৎস কী ছিল—এসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। বিশেষ করে মাদক কারবারের অভিযোগের পর তার সম্পদের উৎস নিয়েও তদন্তের দাবি উঠেছে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, সেন্টুর সঙ্গে কারা নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন, মাদক সংগ্রহ ও সরবরাহের সঙ্গে কারা জড়িত ছিলেন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার খবর তিনি কীভাবে জানতে পারতেন।
সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে কথিত ওয়াকিটকি। সেটি অনুমোদনহীন হলে কেন এবং কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হতো—তার উত্তর এখন তদন্তের বিষয়। একই সঙ্গে গ্রেপ্তারের সময় সেটি তার কাছে না পাওয়ার বিষয়টিও রহস্য আরও বাড়িয়েছে।
সেন্টুর গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে শুধু একজন কথিত মাদক কারবারির বিরুদ্ধে অভিযান শেষ হয়েছে, নাকি এর মাধ্যমে খুলনার আরও বড় কোনো মাদক নেটওয়ার্কের সন্ধান মিলবে—এখন সেই প্রশ্নই সামনে এসেছে। জিজ্ঞাসাবাদ ও পরবর্তী তদন্তে রাজনৈতিক পরিচয়, কথিত ওয়াকিটকি ব্যবহার, মাদক সরবরাহের উৎস এবং সহযোগীদের বিষয়ে নতুন তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
তবে সেন্টুর বিরুদ্ধে ওয়াকিটকি ব্যবহার, পুলিশি অভিযানের আগাম খবর পাওয়া, অপরাধ নেটওয়ার্ক পরিচালনা কিংবা রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগগুলোর সত্যতা তদন্তে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত সেগুলো অভিযোগ হিসেবেই বিবেচিত হবে।

