শার্শা প্রতিনিধি
যশোরের শার্শা উপজেলা সদর ও থানা থেকে মাত্র এক কিলোমিটার দূরে শ্যামলাগাছীর ত্রিমোহনী এলাকায় মাদকের কারবার বন্ধ হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, এলাকার বিভিন্ন অলিগলি, চায়ের দোকানের পেছনে ও বাগানে গাঁজা, ইয়াবা ও ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য কেনাবেচা চলছে। মাঝেমধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান ও গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটলেও মাদকের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে আসছে না।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ত্রিমোহনী এলাকায় দিনে-রাতে বিভিন্ন স্থানে মাদক কেনাবেচা হয়। ক্রেতারা মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে নির্দিষ্ট স্থানে মাদক পৌঁছে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। ভ্যান ও বাইসাইকেল ব্যবহার করে মাদক সরবরাহ করা হচ্ছে বলে দাবি স্থানীয়দের। তাঁদের ভাষ্য, এ কারণে মাদক কেনাবেচার নির্দিষ্ট স্থান শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এলাকায় মাদক কারবারের সঙ্গে একই পরিবারের একাধিক ব্যক্তির সম্পৃক্ততা রয়েছে। মৃত আব্দুল মতিন গাজীর ছেলে শাহাজালাল (৬৩), তাঁর ছেলে সাব্বির আহমেদ এবং ভাইপো সাগর হোসেনের নাম এ ক্ষেত্রে আলোচনায় এসেছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, ২০২৫ সালের ২১ ডিসেম্বর শাহাজালালের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে মাদকদ্রব্যসহ তাঁর ছেলে সাব্বিরকে আটক করা হয়। এ ঘটনায় শার্শা থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা হয়। পরে ২০২৬ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর তাঁকে আবারও মাদকসহ গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছেন স্থানীয়রা। একই বছরের ১০ মে ও ২৫ সেপ্টেম্বর পৃথক ঘটনায় সাগর হোসেনকেও মাদকসহ আটক করা হয়েছিল বলে তাঁদের দাবি। বর্তমানে সাব্বির ও সাগর কারাগারে রয়েছেন বলে জানা গেছে।
এলাকার আরেক বাসিন্দা মৃত আতিয়ারের ছেলে আতাউরের বিরুদ্ধেও মাদকসংক্রান্ত একাধিক মামলার তথ্য দিয়েছেন স্থানীয়রা। তাঁদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালের ১৭ মে, ২০১৬ সালের ১৮ মে, ২০২০ সালের ৫ নভেম্বর, ২০২৩ সালের ২২ জানুয়ারি ও ২৫ জুলাই এবং ২০২৫ সালের ১৭ জুলাই বিভিন্ন সময়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। একই এলাকার মৃত শামসুর রহমানের ছেলে টিটনের বিরুদ্ধেও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা ও আটকের তথ্য রয়েছে। তবে এসব ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সর্বশেষ আইনি অবস্থান স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয়দের দাবি, ত্রিমোহনী ও আশপাশের এলাকায় প্রায় ২০ থেকে ২৫ জন মাদক কারবারি বিভিন্ন স্থানে মাদক বিক্রির সঙ্গে জড়িত। মাদক সরবরাহ ও টাকা-পয়সা নিয়ে কখনো কখনো বিরোধ, বাকবিতণ্ডা ও হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে। তবে ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় অনেকেই প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না বলে জানিয়েছেন তাঁরা।
এলাকায় একটি কিশোর গ্যাং ও মাদক সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকার অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা। তাঁদের আশঙ্কা, মাদকের সহজলভ্যতার কারণে উঠতি বয়সী তরুণদের পাশাপাশি স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের একটি অংশও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। মাদককে কেন্দ্র করে চুরি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বাড়ার আশঙ্কাও করছেন তাঁরা।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, উপজেলা সদর ও থানা থেকে মাত্র এক কিলোমিটার দূরে হয়েও ত্রিমোহনী এলাকায় মাদকের বিস্তার কেন নিয়ন্ত্রণে আসছে না? তাঁদের মতে, মাঝেমধ্যে অভিযান চালিয়ে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। মাদকের উৎস, সরবরাহব্যবস্থা ও সংশ্লিষ্ট চক্র শনাক্ত করে ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনা করা প্রয়োজন।
যশোর জেলা কৃষক দলের সদস্য আলমগীর হোসেন বলেন, ‘মাদক কোনো ব্যক্তি, পরিবার কিংবা দলের বিষয় নয়; এটি সমাজ ও তরুণ প্রজন্ম ধ্বংসের অন্যতম কারণ। ত্রিমোহনীসহ পুরো এলাকায় মাদকের বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে দাঁড়াতে হবে। মাদক কারবারের সঙ্গে যে-ই জড়িত থাকুক, সে যে দলেরই হোক কিংবা যত প্রভাবশালীই হোক, তাকে ছাড় দেওয়া যাবে না।’ মাদক নির্মূলে প্রশাসনের কঠোর ও নিরপেক্ষ পদক্ষেপের পাশাপাশি স্থানীয়দের সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
শার্শা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শামিনুল হক বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান নিয়মিত পরিচালিত হচ্ছে। মাদক কারবারি কিংবা মাদক সরবরাহের সঙ্গে জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। ত্রিমোহনী এলাকায় মাদক কারবারের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে তা যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে স্থানীয়দের সহযোগিতা ও তথ্য প্রদান গুরুত্বপূর্ণ।

