রাসেল আহমেদ, খুলনা প্রতিনিধি
খুলনা জেলা কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট সমিতি (বিসিডিএস) নিয়ে তীব্র দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়েছে। সম্প্রতি গঠিত একটি আহ্বায়ক কমিটিকে কেন্দ্র করে সংগঠনের অভ্যন্তরে তিনটি গ্রুপ মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে। পক্ষপাতিত্ব, রাজনৈতিক প্রভাব এবং দীর্ঘদিনের অনিয়মের অভিযোগ সামনে এনে একটি পক্ষ সরাসরি ধর্মঘটসহ নানা কর্মসূচির হুমকি দিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরে বিসিডিএস খুলনায় একটি বিশেষ রাজনৈতিক গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে ছিল। শেষবার ২০১৪ সালে সমিতির নির্বাচন হলেও এরপর আর কোনো নির্বাচন হয়নি। নিয়মিত নির্বাচন না করে কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে বারবার মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে, যার পেছনে ‘শেখবাড়ি’র প্রভাবের অভিযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে গঠিত ১৫ সদস্যের নতুন আহ্বায়ক কমিটিকে নিয়ে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। অভিযোগ উঠেছে, এই কমিটির ১০ জনই আগের বিতর্কিত কমিটির সদস্য। কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে খান মাহতাব আহমেদকে, যিনি পেশাদার ব্যবসায়ী নন। যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে রয়েছেন খান সাইফুল ইসলাম, যাঁর বিরুদ্ধে ওষুধ সরবরাহ সিন্ডিকেট ও সরকারি হাসপাতালে অনিয়মের অভিযোগ অতীতেও উঠেছে।
বিসিডিএসের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এস এম আজিজুর রহমান বলেন, “৫ আগস্টের সরকারের পতনের পর আওয়ামী ঘরানার সুবিধাভোগীদের দিয়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে। এতে সাধারণ ব্যবসায়ীদের কোনো মতামত নেওয়া হয়নি।” তিনি জানান, খান সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনারের তদন্তে অনিয়ম প্রমাণিত হয়েছে।
বর্তমান কমিটির অন্যান্য সদস্যদের মধ্যেও রয়েছেন পূর্ববর্তী কমিটির আলোচিত কয়েকজন— মো. আব্দুল লতিফ শেখ, আনিছুর রহমান লিটু, মো. ফরিদ উদ্দিন হাওলাদার, হেদায়েতুল ইসলাম পলাশসহ অনেকে, যাদের বিরুদ্ধে ব্যবসায়ী স্বার্থ উপেক্ষা করে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থে কাজ করার অভিযোগ রয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে সাধারণ ব্যবসায়ীদের একটি অংশ শনিবার খুলনা প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে কমিটি বাতিলের দাবি জানায়। ব্যবসায়ী নেতা আজিজুর রহমান লিখিত বক্তব্যে বলেন, “এই একচেটিয়া ও পক্ষপাতদুষ্ট কমিটি বাতিল করে অবিলম্বে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিটি গঠন করে ১২০ দিনের মধ্যে নির্বাচন দিতে হবে। না হলে আমরা চার দফা কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামবো।”
ঘোষিত কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে স্মারকলিপি প্রদান, গণস্বাক্ষর সংগ্রহ, মানববন্ধন এবং খুলনা জেলাব্যাপী ফার্মেসি বন্ধ রাখা। এ বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসনের নীরব ভূমিকা নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন ব্যবসায়ীরা।
এদিকে বর্তমান যুগ্ম আহ্বায়ক খান সাইফুল ইসলাম দাবি করেছেন, এই কমিটি গঠনের পেছনে আমাদের কোনো ভূমিকা নেই। কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে ৯ আগস্ট আহ্বায়ক কমিটি গঠিত হয়েছে।
বিসিডিএসে বর্তমানে তিনটি গ্রুপ সক্রিয়। একদিকে রয়েছেন সোনাডাঙ্গা থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি কবির উদ্দিন বাবলু, অন্যদিকে বিএনপি সংশ্লিষ্ট মামলায় অভিযুক্ত মোজাম্মেল হকের নেতৃত্বে একটি পক্ষ। তৃতীয়ত, সাধারণ ব্যবসায়ীদের একটি দল চাইছে রাজনীতি মুক্ত, গণতান্ত্রিক উপায়ে একটি গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব।
বিশ্লেষকদের মতে, ওষুধ ব্যবসার মতো স্পর্শকাতর খাতে দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচনহীনতা, দলীয় প্রভাব ও গোষ্ঠীকেন্দ্রিক নিয়ন্ত্রণ বিসিডিএসকে একটি বিতর্কিত সংগঠনে পরিণত করেছে। রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া থেকে বের হয়ে গণতান্ত্রিক ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব নির্বাচনই হতে পারে চলমান সংকটের সমাধান।

