মো.এনামুল হক, পঞ্চগড় জেলা প্রতিনিধি
প্রতিটি বুধবার এখন পঞ্চগড় জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের একটি বিশেষ দিন। সকাল থেকেই বাড়তে থাকে জনসমাগম। কারণ, এ দিনটি নির্ধারিত থাকে সাপ্তাহিক গণশুনানির জন্য। যেখানে জেলার নানা প্রান্ত থেকে আসা মানুষজন জেলা প্রশাসকের মুখোমুখি হয়ে তাদের দুঃখ-কষ্ট, সমস্যা ও অনুরোধের কথা তুলে ধরেন।
জেলা প্রশাসক সাবেত আলী তাঁর আন্তরিকতা, ধৈর্য ও দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের দক্ষতা দিয়ে সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করেছেন। গণশুনানির সময় আবেদনকারীদের পাশের চেয়ারে বসিয়ে সরাসরি অভিযোগ শুনে সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেন তিনি। কারো জমি সংক্রান্ত সমস্যা, কারো সন্তানের লেখাপড়ার খরচ, কেউবা এসেছে কর্মসংস্থানের আশায়—সবাই পাচ্ছে সহযোগিতার হাত।
গণশুনানির এই উদ্যোগ শুরু হয় সাবেত আলীর পঞ্চগড়ে যোগদানের পর। স্থানীয় সমস্যা, সম্ভাবনা ও উন্নয়নকে সামনে রেখে একটি বৃহৎ কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এ কার্যক্রমের পুনঃসূচনা করা হয়। শুরুতে কমসংখ্যক মানুষ এলেও এখন প্রতি সপ্তাহে ১০০ থেকে ১৫০ জন আবেদনকারী অংশগ্রহণ করছেন।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক মাসে এই গণশুনানির মাধ্যমে—
* ৬০০+ জনকে চিকিৎসা ও আর্থিক সহায়তা
* ৯২টি জমি সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান
* ২৫ জন শিক্ষার্থীকে বই সরবরাহ
* ২৬ জনকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি সহায়তা
* ৫ দরিদ্র শিক্ষার্থীকে বাইসাইকেল
* ৫ প্রতিবন্ধীকে হুইলচেয়ার
* ৫ জনকে অটোরিকশা, ১ জনকে গরু, ১০ জনকে সেলাই মেশিন
* ৫ জনকে ল্যাপটপ, ১ জনকে টিউশনের জন্য ফার্নিচার সহায়তা
এছাড়াও, গণশুনানির আলোকে বিভিন্ন এলাকার উন্নয়নের জন্য জিআর, টিআর ও কাবিখা বরাদ্দও দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা গণশুনানিকে দেখছেন প্রশাসনের মানবিক রূপ হিসেবে। শিংরোডের হাকিম উদ্দিন বলেন, “অনেক কর্মকর্তার কাছে গিয়েছি, কেউ পাশে বসায়নি। কিন্তু ডিসি স্যার পাশে বসিয়ে কথা শুনেছেন, আমার মেয়ের বিয়ের জন্য সহায়তাও দিয়েছেন।”
আব্দুল ওয়াদুদ বলেন, “রাস্তার ব্যাপারে বহুবার চেষ্টা করেছি। শেষমেশ ডিসির গণশুনানিতে এসেই সমাধান পেয়েছি।”
সমির উদ্দিন বলেন, “আমি কিডনি রোগী। গণশুনানিতে এসেই সহায়তা পেয়েছি।”
পরিবেশ কর্মী নয়ন তানবীরুল বারী মনে করেন, “এই কার্যক্রম জনগণ ও প্রশাসনের সম্পর্ককে ঘনিষ্ঠ করেছে। এটি একেবারে জনবান্ধব ব্যবস্থার উদাহরণ।”
জেলা প্রশাসক সাবেত আলী বলেন, “মানুষজন তাদের নানাবিধ সমস্যা নিয়ে আসে, আমরা চেষ্টা করি বাস্তবভিত্তিক সমাধান দিতে। গরিব, অসহায় ও কর্মহীনদের জন্য পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও করছি। গণশুনানির মাধ্যমে মানুষের আস্থা ও অংশগ্রহণ দিন দিন বাড়ছে।”
এভাবেই প্রশাসন যখন মানুষের পাশে দাঁড়ায়, তখন সৃষ্টি হয় এক নতুন আস্থার সেতুবন্ধন—যেখানে সরকারী দপ্তরগুলো হয়ে ওঠে হয়রানিমুক্ত, গণমুখী ও মানবিক।

