বেনাপোল (যশোর) প্রতিনিধি
যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দরে পণ্য ওজন পরিমাপকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। বন্দরের পচনশীল পণ্য স্কেলকে ঘিরে একটি সংঘবদ্ধ চক্র পরিকল্পিতভাবে ওজন জালিয়াতি করে বিপুল পরিমাণ সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, স্কেল পরিচালনার সফটওয়্যারের আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে কৃত্রিমভাবে ওজন বাড়িয়ে বা কমিয়ে দেখানো হচ্ছে। এর মাধ্যমে প্রকৃত শুল্ক পরিশোধ ছাড়াই পণ্য ছাড়ের সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। এ ঘটনায় বন্দরের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সম্পৃক্ততার অভিযোগও উঠেছে। ইতোমধ্যে বিষয়টি তদন্তে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
সূত্র জানায়, ‘রোকেয়া ট্রেডার্স’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান ভারত থেকে ডাব্লিউবি-২৩-এফ-৮১৪২ নম্বর ট্রাকে আঙ্গুর আমদানি করে। চালানটির ম্যানিফেস্ট নম্বর ৬০১-২০২৬-০০১-০০২৫৮৩৩/০৪, তারিখ ২৫ এপ্রিল ২০২৬। পণ্যটি ছাড়করণের দায়িত্বে ছিল সিএন্ডএফ প্রতিষ্ঠান ‘উৎস শিপিং লাইন্স’।
গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, ২৫ ও ২৬ এপ্রিল বন্দরের ৩১ নম্বর পচনশীল পণ্য স্কেলে ট্রাকটির ওজন পরিমাপে অস্বাভাবিক গড়মিল ধরা পড়ে। খালি ট্রাকটির প্রকৃত ওজন ১৩ হাজার ৩১০ কেজি হলেও স্কেল স্লিপে তা দেখানো হয় ১৩ হাজার ৮৮০ কেজি—অর্থাৎ ৫৭০ কেজি বেশি। অভিযোগ রয়েছে, এই অতিরিক্ত ওজন দেখানো স্লিপ পরবর্তীতে বিভিন্ন চালানে ব্যবহার করে শুল্ক ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে।
হিসাব অনুযায়ী, শুধু আঙ্গুরের ক্ষেত্রেই এই অতিরিক্ত ৫৭০ কেজির ভিত্তিতে প্রায় ৭ লাখ টাকার শুল্ক ফাঁকি দেওয়া সম্ভব। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একই কৌশলে উচ্চ শুল্কযুক্ত পণ্যের ক্ষেত্রে প্রতি চালানে ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাবি, বন্দরের পচনশীল পণ্য ইয়ার্ডে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। তাদের অভিযোগ, কিছু সিএন্ডএফ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, ওয়ারহাউস সুপারিনটেনডেন্ট এবং ট্রাফিক বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তা মিলে প্রতিটি ভারতীয় ট্রাক থেকে ১ থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করছে। এর বিনিময়ে ওজন কারসাজির মাধ্যমে শুল্ক কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
এ ধরনের অনিয়মের প্রভাব জাতীয় রাজস্ব খাতে পড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে প্রায় ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যার পেছনে বন্দরের অনিয়মকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত বছরের আগস্টের পর থেকে কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে এই সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে এবং এখনও সক্রিয় রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বন্দরে প্রবেশ করা ট্রাকগুলোর পূর্ববর্তী ওজন রেকর্ড যাচাই করলে প্রকৃত চিত্র সহজেই বেরিয়ে আসবে।
অভিযোগের বিষয়ে ওয়ারহাউস সুপারিনটেনডেন্ট আশিকুর রহমান রনি বলেন, তিনি অতিরিক্ত দায়িত্বে রয়েছেন এবং ওজনের গড়মিল যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে হয়ে থাকতে পারে। ট্রাফিক পরিদর্শক হাফিজুর রহমান মিয়া বলেন, সংশ্লিষ্ট ঘটনায় তার আইডিতে ওজনের গড়মিল হয়েছে, যা প্রযুক্তিগত ত্রুটি হতে পারে।
এদিকে বেনাপোল স্থলবন্দরের পরিচালক শামিম হোসেন জানিয়েছেন, বিষয়টি তদন্তে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত শেষে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সংশ্লিষ্ট মহল বলছে, বন্দরকেন্দ্রিক এ ধরনের প্রযুক্তিনির্ভর জালিয়াতি বন্ধে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। অন্যথায় রাজস্ব খাতে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে এবং বন্দর ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে।

