দৌলতপুর (কুষ্টিয়া) প্রতিনিধি
বাবা-মাকে হারিয়ে কিংবা পারিবারিক নানা প্রতিকূলতায় কুষ্টিয়া সরকারি শিশু পরিবারে বেড়ে ওঠা পাঁচ শিক্ষার্থী এখন নতুন এক সংকটের মুখে। সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ায় তাঁদের শিশু পরিবার ছাড়তে বলা হয়েছে। কিন্তু সামনে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা, নেই স্থায়ী আবাসন কিংবা আর্থিক নিরাপত্তা। ফলে ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তায় পড়েছেন তারা।
শিশু বয়সে আশ্রয় পাওয়া এসব শিক্ষার্থী দীর্ঘদিন শিশু পরিবারে থেকেই পড়াশোনা করে এসএসসি ও এইচএসসি পাস করে উচ্চশিক্ষায় ভর্তি হয়েছেন। কিন্তু বয়স ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ায় তাঁদের প্রতিষ্ঠান ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তাদের একজন আকাশ ইসলাম। এক বছর বয়সে বাবাকে হারানোর পর মা অন্যত্র চলে গেলে ২০০৭ সালে ফুফুর মাধ্যমে শিশু পরিবারে ভর্তি হন তিনি। বর্তমানে কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের স্নাতক প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। আগামী ২৭ জুলাই থেকে তাঁর প্রথম বর্ষের চূড়ান্ত পরীক্ষা শুরু হবে। এরই মধ্যে তাঁকে শিশু পরিবার ছাড়তে বলা হয়েছে। দাদা মারা গেছেন, দাদি অসুস্থ। আপাতত ফুফুর বাড়িতে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।
একই সংকটে রয়েছেন আকাশ শেখ। ২০১১ সালে বাবার মৃত্যুর পর দারিদ্র্যের কারণে তাঁকে শিশু পরিবারে রাখা হয়। বর্তমানে কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের রসায়ন বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। সামনে পরীক্ষা, কিন্তু থাকার জায়গা নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তাঁর। সংসারে মা ও বড় ভাই থাকলেও আর্থিক সংকটের কারণে তাঁর পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
এ ছাড়া তুষার আহাম্মেদ, আলফাজ হোসেন ও অভি হাসানও ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ায় শিশু পরিবার ছাড়ার নির্দেশ পেয়েছেন। বাবার মৃত্যু, দারিদ্র্য, মায়ের দ্বিতীয় বিয়ে কিংবা স্বজনদের অক্ষমতার কারণে ছোটবেলায় তারা শিশু পরিবারে আশ্রয় পেয়েছিলেন।
আলফাজ হোসেন বলেন, “বাবার মৃত্যুর পর মা অন্যত্র বিয়ে করেন। বর্তমানে এইচএসসি প্রথম বর্ষে পড়ছি। থাকার মতো কোনো স্থায়ী জায়গা নেই। অন্তত এইচএসসি পরীক্ষা পর্যন্ত এখানে থাকতে পারলে পড়াশোনা শেষ করতে পারতাম।”
তুষার আহাম্মেদ বলেন, “উচ্চশিক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। কিন্তু এখন আশ্রয় হারালে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।”
অভি হাসানও বলেন, নিরাপদ আশ্রয় না থাকলে তাঁর পক্ষে লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না।
শিক্ষার্থীদের দাবি, ১৮ বছর পূর্ণ হলেই একজন এতিম বা অসহায় তরুণ স্বাবলম্বী হয়ে ওঠে না। তাই অন্তত চলমান পরীক্ষা ও পড়াশোনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত শিশু পরিবারে থাকার সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মো. আব্দুল লতিফ বলেন, “নীতিমালা অনুযায়ী ১৮ বছর পর্যন্ত শিশু পরিবারে থাকার সুযোগ রয়েছে। তবে শিক্ষার্থীদের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। তাঁদের সাময়িক আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষাবৃত্তি ও কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেওয়ার বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া হবে।”
কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক (ডিসি) তৌহিদ বিন-হাসান বলেন, “বিষয়টি আমার নজরে এসেছে। তাঁদের কীভাবে সহযোগিতা করা যায়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।”
বয়সসীমার বিধান আর শিক্ষাজীবনের বাস্তবতার দ্বন্দ্বে পড়া এই পাঁচ শিক্ষার্থী এখন মানবিক সহায়তার অপেক্ষায়। তাঁদের আশা, অন্তত পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত মাথা গোঁজার একটি নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত হবে।

