রাসেল আহমেদ, খুলনা প্রতিনিধি
খুলনার তেরখাদা উপজেলায় আবারও তীব্র লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। দিনের পাশাপাশি রাতেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, অটোরিকশাচালক, চাকরিজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। এরই মধ্যে অনেক গ্রাহকের বিদ্যুৎ বিল আগের মাসের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় ক্ষোভ আরও বাড়ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে উপজেলার প্রায় সব এলাকায় নিয়মিত লোডশেডিং চলছে। কোথাও আধা ঘণ্টা, কোথাও দুই থেকে তিন ঘণ্টা, আবার কোনো কোনো এলাকায় এর চেয়েও বেশি সময় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের মানুষ সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন। রাতে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় গরমে অতিষ্ঠ হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।
উপজেলায় প্রায় ১ লাখ ২৮ হাজার ৯২২ মানুষের বসবাস। পল্লী বিদ্যুতের গ্রাহক রয়েছেন প্রায় ২৬ হাজার। স্থানীয়দের দাবি, বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে যাওয়ায় পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ব্যবহার কম হলেও অনেক গ্রাহকের বিল আগের তুলনায় দ্বিগুণ, এমনকি তিনগুণ পর্যন্ত এসেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
উপজেলার বাসিন্দা দিলীপ রায় বলেন, “জুন মাসে আমার বিদ্যুৎ বিল ছিল ৪৫০ টাকা। কিন্তু জুলাই মাসে দুই হাজার টাকার বেশি বিল এসেছে। এত লোডশেডিংয়ের মধ্যে বিদ্যুৎ ব্যবহারও কম হয়েছে। তারপরও এত বেশি বিল কীভাবে এলো, বুঝতে পারছি না।”
অটোরিকশাচালক দিদার শেখ বলেন, “রাতে টানা চার থেকে ছয় ঘণ্টা চার্জ দিতে না পারলে পরদিন গাড়ি চালানো যায় না। কিন্তু নিয়মিত লোডশেডিংয়ের কারণে ঠিকমতো চার্জ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এতে আয়ও কমে যাচ্ছে।”
এইচএসসি পরীক্ষার্থী সুস্মিতা পোদ্দার বলেন, “পরীক্ষার সময় বারবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় রাতে পড়াশোনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। গরমের কারণে মনোযোগও ধরে রাখা যাচ্ছে না।”
স্থানীয় রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ী প্রেম দাস বলেন, “ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে গ্রাহকদের সেবা দিতে সমস্যা হচ্ছে। এতে প্রতিদিনই আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছি।”
কাটেঙ্গা বাজারের কম্পিউটার ব্যবসায়ী রনি সকাতি বলেন, “আমাদের সব কাজই বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেটনির্ভর। বিদ্যুৎ না থাকলে দিনের বড় একটা সময় কাজ বন্ধ থাকে। এতে ব্যবসায় ক্ষতি হচ্ছে, গ্রাহকদেরও ভোগান্তি বাড়ছে।”
বুলবুল ফার্মেসির মালিক রবিউল ইসলাম বলেন, “এখন এমন অবস্থা হয়েছে, বিদ্যুৎ আসার চেয়ে যাওয়ার সময়ই বেশি। রোগীদেরও সেবা দিতে সমস্যা হচ্ছে। দ্রুত এ পরিস্থিতির সমাধান প্রয়োজন।”
এ বিষয়ে তেরখাদা পল্লী বিদ্যুতের সাব-জোনাল অফিসের সহকারী জেনারেল ম্যানেজার (ওঅ্যান্ডএম) মো. তৌফিক ওমর বলেন, “উপজেলায় প্রায় ২৬ হাজার গ্রাহকের জন্য বিদ্যুতের চাহিদা সাড়ে পাঁচ মেগাওয়াট। কিন্তু বর্তমানে জাতীয় গ্রিড থেকে আমরা মাত্র আড়াই মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাচ্ছি। সরবরাহ ঘাটতির কারণেই বাধ্য হয়ে লোডশেডিং করতে হচ্ছে।”
বিদ্যুৎ বিলের বিষয়ে তিনি বলেন, “কোনো গ্রাহকের বিল নিয়ে অভিযোগ থাকলে তিনি অফিসে যোগাযোগ করতে পারেন। অভিযোগের ভিত্তিতে মিটার ও বিল যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করার পাশাপাশি অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের অভিযোগ তদন্ত করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হোক। তাদের মতে, একদিকে দীর্ঘ লোডশেডিং, অন্যদিকে বাড়তি বিদ্যুৎ বিল—দুই সংকটে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ দিন দিন বেড়েই চলেছে।

