রাসেল আহমেদ, খুলনা প্রতিনিধি
খুলনার রূপসা উপজেলার আলাইপুর ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ আবু সাঈদ খানের বিরুদ্ধে নিয়োগে অর্থ লেনদেন, আর্থিক অনিয়ম, সরকারি নির্দেশনা অমান্য, শিক্ষক-কর্মচারীদের অর্থ আত্মসাৎ ও স্বেচ্ছাচারিতাসহ নানা অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের প্রতিকার চেয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) এবং রূপসা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
১৯৯৪ সালের ২০ এপ্রিল প্রতিষ্ঠিত কলেজটির গভর্নিং বডির অভিভাবক সদস্য পুটিমারী এলাকার বাসিন্দা মো. আঃ হালিম শেখ বিভিন্ন দপ্তরে দেওয়া লিখিত অভিযোগে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ করেন। তার দাবি, কলেজের বিভিন্ন খাতের অর্থ ব্যবস্থাপনা, শিক্ষক-কর্মচারীদের পাওনা এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের মাধ্যমে আর্থিক সুবিধা নেওয়া হয়েছে।
অভিযোগকারী আঃ হালিম শেখের দাবি, এর আগে এসব অনিয়মের বিষয়ে অভিযোগ করার পর বিষয়টি নিয়ে তার ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়। একপর্যায়ে কিছু অর্থ ফেরত দিয়ে কলেজের সীমানাপ্রাচীরসহ কয়েকটি উন্নয়নকাজ করা হয় বলেও তিনি দাবি করেন। তবে এসব অর্থের উৎস, পরিমাণ ও ব্যয়ের হিসাব সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই ছাড়া নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়।
লিখিত অভিযোগে অধ্যক্ষ আবু সাঈদ খানের উপাধ্যক্ষ পদে নিয়োগ এবং পরবর্তীতে অধ্যক্ষ হওয়ার প্রক্রিয়া নিয়েও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তৎকালীন কলেজ পরিচালনা পর্ষদের কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে যোগসাজশ করে অর্থের বিনিময়ে তাকে উপাধ্যক্ষ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। পরে ২০২৩ সালে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে অধ্যক্ষ পদে নিয়োগ পাওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়, উপাধ্যক্ষ পদে থাকা অবস্থায় পদটি যথাযথভাবে শূন্য না করেই নতুন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। একই সময়ে উপাধ্যক্ষ পদের বেতন-ভাতা উত্তোলনের অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগ যাচাইয়ের জন্য নিয়োগসংক্রান্ত নথি, গভর্নিং বডির সভার কার্যবিবরণী, অনুমোদন এবং বেতন-ভাতার রেকর্ড পর্যালোচনা প্রয়োজন।
কলেজে কর্মচারী নিয়োগে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, সাবেক অধ্যক্ষ, নাইট গার্ড ও দুই ল্যাব সহকারীসহ চারজন কর্মচারী নিয়োগে প্রায় ৫৫ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৩ সালের ২২ আগস্ট উপাধ্যক্ষ ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী/এমএলএসএস পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের আগেই যথাক্রমে ১৭ লাখ ও ৮ লাখ টাকার গোপন চুক্তি করা হয়েছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এসব অর্থ লেনদেনের অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা ব্যাংক নথি বা অন্য কোনো প্রমাণ প্রতিবেদকের হাতে আসেনি।
কলেজের অডিট নিয়েও অভিযোগ করেছেন শিক্ষক-কর্মচারীদের একাংশ। অভিযোগকারীদের দাবি, ২০২১ সালে মন্ত্রণালয়ের অডিটের কথা বলে কলেজের শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছ থেকে এক মাসের বেতনের অর্ধেক সমপরিমাণ অর্থ নেওয়া হয়। পরে অডিটের জন্য ওই অর্থ ব্যয় করা হয়নি বলে তারা জানতে পারেন। টাকা ফেরত দেওয়ার কথা বলা হলেও তা ফেরত দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
কলেজের ব্যাংক হিসাব পরিচালনা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাদের দাবি, গভর্নিং বডির বাইরে থাকা তৎকালীন উপজেলা চেয়ারম্যান এস এম হাবিবকে ব্যাংকের যৌথ হিসাব পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। এরপর কয়েক বছর ধরে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন, টিউশন ফি ও বিভিন্ন সরকারি উন্নয়ন বরাদ্দের অর্থ ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
তবে এ অভিযোগ যাচাইয়ের জন্য কলেজের ব্যাংক হিসাব, ভাউচার, আয়-ব্যয়ের বিবরণী এবং সংশ্লিষ্ট অনুমোদন পর্যালোচনা প্রয়োজন।
২০২৬ সালের ৫ আগস্ট সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী কর্মসূচি পালন না করার অভিযোগও উঠেছে কলেজ কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। অভিযোগকারীদের দাবি, ওই দিন সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী জাতীয় পতাকা উত্তোলন, আলোচনা সভাসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালনের কথা থাকলেও আলাইপুর ডিগ্রি কলেজে কোনো কর্মসূচি পালন করা হয়নি। বরং কলেজ বন্ধ ও তালাবদ্ধ ছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অধ্যক্ষের পাশাপাশি কলেজের সহকারী অধ্যাপক সুধাংশু গাইনের বিরুদ্ধেও দায়িত্ব পালনে অনিয়মের অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে অবস্থান করেও নিয়মিত বেতন-ভাতা উত্তোলন করেছেন এবং দেশে ফিরে পূর্বের তারিখে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করেছেন।
তবে এ অভিযোগ যাচাই করতে তার ছুটির রেকর্ড, হাজিরা খাতা, বিদেশযাত্রার তথ্য এবং বেতন-ভাতার নথি পর্যালোচনা প্রয়োজন।
অভিযোগকারীরা বলছেন, কলেজের আর্থিক লেনদেন, নিয়োগ প্রক্রিয়া, ব্যাংক হিসাব, অডিট এবং শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতার বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত হলে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে। তারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে এসব বিষয়ে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে আলাইপুর ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ আবু সাঈদ খান এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই। যেকোনো ধরনের তদন্ত বা পদক্ষেপ নেওয়া হলেও এতে তার কোনো সমস্যা নেই।

