যশোর প্রতিনিধি
শাহানারা বেগম নামটি এখন যশোরসহ পুরো অঞ্চলে অনুপ্রেরণার প্রতীক। সীমাহীন সংগ্রাম, ত্যাগ আর অদম্য ইচ্ছাশক্তি দিয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন এক আলোকিত পরিবার। তার চার সন্তানই আজ চিকিৎসক হিসেবে দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। শুধু সন্তানরাই নয়, পরিবারের জামাই ও পুত্রবধূরাও চিকিৎসা পেশায় নিয়োজিত।
যশোরের কেশবপুর পৌরসভার ৭ নম্বর মধ্যকুল ওয়ার্ডের বাসিন্দা শাহানারা বেগম একজন হোমিও চিকিৎসক। জীবনের কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও তিনি কখনো সন্তানদের শিক্ষার বিষয়ে আপস করেননি। তার বিশ্বাস ছিল— শিক্ষাই পারে দারিদ্র্য ও সংগ্রামের অন্ধকার দূর করতে। সেই বিশ্বাসই আজ বাস্তবে রূপ নিয়েছে।
তার চার সন্তান হলেন— ডা. ফারহানা রহমান শম্পা, ডা. সানজানা রহমান লোপা, ডা. হাদিউর রহমান সিয়াম এবং ডা. ফাহরিয়া রহমান ত্রোপা। তাদের প্রত্যেকেই দেশের স্বনামধন্য মেডিকেল ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে পড়াশোনা শেষ করে চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত রয়েছেন।
বড় মেয়ে ডা. ফারহানা রহমান শম্পা চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিভিএম সম্পন্ন করে বেলজিয়াম থেকে এমএস ডিগ্রি অর্জন করেছেন। বর্তমানে তিনি মহাখালী স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে রোগতত্ত্ব গবেষক হিসেবে কর্মরত। দ্বিতীয় মেয়ে ডা. সানজানা রহমান লোপা খুলনা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে গাইনি বিষয়ে এমএস সম্পন্ন করে বর্তমানে স্ত্রী ও প্রসূতি রোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
একমাত্র ছেলে ডা. হাদিউর রহমান সিয়াম ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস শেষ করে বর্তমানে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কর্মরত আছেন। পাশাপাশি বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে এফসিপিএস করছেন। ছোট মেয়ে ডা. ফাহরিয়া রহমান ত্রোপা বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস সম্পন্ন করে বর্তমানে রেডিওলজি বিষয়ে এমডি করছেন।
শাহানারা বেগমের স্বামী মো. হাবিবুর রহমান একসময় আর্মি মেডিকেল কোরে কর্মরত ছিলেন। গুরুতর অসুস্থতার কারণে চাকরি ছাড়তে হলে সংসারে নেমে আসে চরম সংকট। সেই সময় স্বামীকে সেবা করার পাশাপাশি নিজেই হোমিওপ্যাথিক কলেজে ভর্তি হন শাহানারা বেগম। পরে কেশবপুরে এসে হোমিও চিকিৎসা শুরু করেন। ধীরে ধীরে স্বামীও চশমার দোকানে বসে চোখের রোগীদের সেবা দিতে থাকেন।
অভাব-অনটনের মাঝেও সন্তানদের নৈতিক শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তুলতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন এই মা। তার ছোট মেয়ে ডা. ফাহরিয়া রহমান ত্রোপা বলেন, “মা হয়তো আমাদের সব চাহিদা পূরণ করতে পারেননি, কিন্তু ন্যায়নীতি, আদর্শ ও চরিত্র গঠনে কখনো কমতি রাখেননি। মানুষের সেবা করাই প্রকৃত ধর্ম— এই শিক্ষাই তিনি আমাদের দিয়েছেন।”
শাহানারা বেগম বলেন, “অসুস্থ মানুষকে সুস্থ করে তোলার মধ্যে অন্যরকম তৃপ্তি আছে। তাই আমি চেয়েছিলাম আমার সন্তানরাও মানুষের সেবায় নিয়োজিত হোক। আল্লাহর রহমতে আজ তারা সেই পথেই আছে।”
সংগ্রাম, ত্যাগ ও শিক্ষার শক্তিতে গড়ে ওঠা এই পরিবার আজ সমাজের জন্য এক উজ্জ্বল উদাহরণ। একজন মায়ের অদম্য ইচ্ছাশক্তি কীভাবে একটি পরিবারকে আলোকিত করতে পারে, তার জীবন্ত দৃষ্টান্ত শাহানারা বেগম।

