খুলনা প্রতিনিধি
খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) চলতি অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতায় বাস্তবায়িত উন্নয়নকাজ নিয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নথিপত্র পর্যালোচনা ও মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অধিকাংশ উন্নয়নকাজ উন্মুক্ত দরপত্রের পরিবর্তে রিকোয়েস্ট ফর কোটেশন (আরএফকিউ) পদ্ধতিতে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কার্যাদেশ এক প্রতিষ্ঠানের নামে হলেও বাস্তবে কাজ করছেন বিএনপি ও ছাত্রদলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা—এমন অভিযোগও উঠেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত প্রায় তিন মাসে অন্তত ৪২টি উন্নয়নকাজের কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। এসব কাজের বড় অংশই খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জুর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিদের কাছে গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে পাঁচ লাখ টাকার বেশি মূল্যের কাজ ছোট ছোট প্যাকেজে ভাগ করে কোটেশন পদ্ধতিতে কার্যাদেশ দেওয়ার বিষয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সরকারি ক্রয় বিধিমালা অনুযায়ী পাঁচ লাখ টাকার নিচের জরুরি ভৌত কাজ কোটেশন পদ্ধতিতে করা গেলেও বড় কাজকে কৃত্রিমভাবে ভাগ করে উন্মুক্ত দরপত্র এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কেসিসির নথি অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে ৩৪ কোটি ৩৫ লাখ টাকার থোক বরাদ্দ থেকে বিভিন্ন সড়ক, ড্রেন, সীমানাপ্রাচীর, মসজিদ ও অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
মাঠপর্যায়ে দেখা গেছে, মতিয়াখালী, টুটপাড়া, চানমারী, লবণচরা, পুলিশ লাইন ও ২৭ নম্বর ওয়ার্ডসহ বিভিন্ন এলাকায় কার্যাদেশপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে স্থানীয় বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের নেতারা উন্নয়নকাজ পরিচালনা করছেন।
এ ছাড়া লিনিয়ার পার্কের প্রায় ১০ লাখ টাকার সীমানাপ্রাচীর নির্মাণকাজ দুটি আলাদা প্যাকেজে ভাগ করে দুটি প্রতিষ্ঠানের নামে কার্যাদেশ দেওয়া হলেও বাস্তবে একই ব্যক্তি কাজ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি সরকারি ক্রয় বিধিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
কার্যাদেশ বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রাক্কলিত ব্যয়ের তুলনায় খুব সামান্য কম দরে কাজ দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, উন্মুক্ত দরপত্র হলে অধিক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে আরও কম ব্যয়ে কাজ বাস্তবায়নের সুযোগ ছিল।
এদিকে সরকারি ক্রয় বিধিমালায় কোটেশন আহ্বানের নোটিশ ওয়েবসাইট, নোটিশ বোর্ড ও জনসমাগমস্থলে প্রকাশের বাধ্যবাধকতা থাকলেও কেসিসির ওয়েবসাইট বা পূর্ত বিভাগের নোটিশ বোর্ডে এসব কাজের নোটিশ পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে সাধারণ ঠিকাদারদের অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে সুজন খুলনা জেলা সভাপতি অ্যাডভোকেট কুদরত-ই-খুদা বলেন, বিধিগতভাবে কিছু বিষয় বৈধ হলেও প্রশাসকের ঘনিষ্ঠদের মধ্যে অধিকাংশ কাজ বণ্টন হওয়ায় স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
তবে কেসিসি প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে নগরীর অনেক সড়ক সংস্কারবঞ্চিত ছিল। দ্রুত কাজ শেষ করার স্বার্থে সরকারি ক্রয় বিধিমালা অনুসরণ করে কোটেশন পদ্ধতিতে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়, কাজ করার সক্ষমতা বিবেচনায় দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।
অন্যদিকে কেসিসির পূর্ত বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তা অনানুষ্ঠানিকভাবে জানান, কোটেশন সংক্রান্ত নোটিশ প্রকাশের বিধান থাকলেও অতীতেও তা নিয়মিত অনুসরণ করা হয়নি। বর্তমানে উন্নয়নকাজের আবেদন ও দাপ্তরিক চাপ বেড়ে যাওয়ায় কার্যক্রম পরিচালনায়ও জটিলতা তৈরি হয়েছে।
অভিযোগ, পাল্টা ব্যাখ্যা এবং বিধিমালা বাস্তবায়নের প্রশ্নে খুলনা সিটি করপোরেশনের উন্নয়নকাজের কার্যাদেশ প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

