Nabadhara
ঢাকাশনিবার , ৮ আগস্ট ২০২৬
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. ইতিহাস
  5. কৃষি
  6. খুলনা বিভাগ
  7. খেলাধুলা
  8. চট্টগ্রাম বিভাগ
  9. জাতীয়
  10. জামালপুর
  11. জেলার সংবাদ
  12. ঝালকাঠি
  13. ঝিনাইদহ
  14. ঢাকা বিভাগ
  15. তথ্যপ্রযুক্তি
আজকের সর্বশেষ সবখবর

দৌলতপুরে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে সোনাইকুণ্ডির নীলকুঠি

দৌলতপুর (কুষ্টিয়া) প্রতিনিধি
আগস্ট ৮, ২০২৬ ৫:৩৬ অপরাহ্ণ
Link Copied!

দৌলতপুর (কুষ্টিয়া) প্রতিনিধি

ইতিহাস কখনো মুছে যায় না। সময়ের ব্যবধানে তার রূপ বদলায়, কিন্তু রেখে যায় স্মৃতি ও সাক্ষ্য। কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার হোগলবাড়িয়া ইউনিয়নের সোনাইকুণ্ডি গ্রামের নীলকুঠি ভবনটি তেমনই এক জীবন্ত ইতিহাস। প্রায় দুই শতাব্দী ধরে দাঁড়িয়ে থাকা ভবনটি একসময় ব্রিটিশ নীলকরদের অত্যাচার-নির্যাতনের সাক্ষী হলেও বর্তমানে সেখানে পরিচালিত হচ্ছে ইউনিয়ন ভূমি অফিসের কার্যক্রম। যে স্থানে একসময় কৃষকদের আর্তনাদ শোনা যেত, সেই স্থানেই এখন মানুষ পাচ্ছেন ভূমিসংক্রান্ত সরকারি সেবা।

ইতিহাস-সংশ্লিষ্ট সূত্র ও স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ১৮০০ সালের দিকে চুন-সুরকি দিয়ে নির্মিত ছয় কক্ষের এ ভবনটি ছিল ব্রিটিশ নীলকরদের অন্যতম প্রশাসনিক কেন্দ্র। ভবনের চারপাশে এখনো দাঁড়িয়ে আছে সাতটি প্রাচীন দেবদারু গাছ। সময়ের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এসব গাছ ও পুরোনো ভবনটি বহন করছে প্রায় দুই শতাব্দীর ইতিহাস।

১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধের পর বাংলার রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলে যায়। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন প্রতিষ্ঠার পর ইউরোপে প্রাকৃতিক নীলের চাহিদা বাড়তে থাকে। ১৭৭৭ সালের পর বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে গড়ে ওঠে অসংখ্য নীলকুঠি। উর্বর জমি, পদ্মা নদীর নৌপথ ও কৃষির অনুকূল পরিবেশের কারণে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরও নীল উৎপাদনের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে ওঠে।

তবে নীলচাষ কৃষকদের জন্য সমৃদ্ধির পথ তৈরি করেনি; বরং তা হয়ে ওঠে শোষণ ও নির্যাতনের প্রতীক। কৃষকদের অগ্রিম অর্থ দেওয়া হতো, যা স্থানীয়ভাবে ‘দাদন’ নামে পরিচিত ছিল। পরবর্তীতে সেই দাদনই কৃষকদের জন্য শোষণের হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়। খাদ্যশস্যের পরিবর্তে কৃষকদের নীল চাষে বাধ্য করা হতো। কেউ এতে অস্বীকৃতি জানালে লাঠিয়াল বাহিনী দিয়ে হামলা, মারধর, ঘরবাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের মতো নির্যাতনের অভিযোগ ছিল নীলকরদের বিরুদ্ধে।

একপর্যায়ে কৃষকদের মধ্যে জমতে থাকে ক্ষোভ। ১৮৫৯-৬০ সালের ঐতিহাসিক নীল বিদ্রোহ সেই ক্ষোভেরই বিস্ফোরণ। নীল চাষে বাধ্য করার বিরুদ্ধে বাংলার কৃষকেরা ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। সেই আন্দোলন কৃষকের অধিকার, আত্মমর্যাদা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে। দৌলতপুরের সোনাইকুণ্ডির নীলকুঠিও সেই সময়ের ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে টিকে আছে।

সময়ের পরিবর্তনে সেই চিত্রও পাল্টে গেছে। যে ভবনে একসময় বিদেশি নীলকরদের প্রশাসনিক কার্যক্রম চলত এবং কৃষকদের ভাগ্য নির্ধারিত হতো, বর্তমানে সেখানেই পরিচালিত হচ্ছে হোগলবাড়িয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিস। যে দরজা দিয়ে একসময় কৃষকেরা ভয়ে প্রবেশ করতেন, সেই দরজা দিয়েই এখন মানুষ জমির খতিয়ান, নামজারি, ভূমি উন্নয়ন করসহ বিভিন্ন সরকারি সেবা নিতে আসেন।

স্থানীয় বাসিন্দা কাওছার বিশ্বাস বলেন, “দৌলতপুরের এই নীলকুঠি শুধু একটি পুরোনো ভবন নয়; এটি আমাদের ইতিহাস, সংগ্রাম ও ঐতিহ্যের অমূল্য নিদর্শন। যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হলে ভবনটি গবেষক, ইতিহাসপ্রেমী ও পর্যটকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আকর্ষণ হয়ে উঠতে পারে।”

হোসেনাবাদ গ্রামের প্রবীণ আব্দুল মান্নান বলেন, “ছোটবেলায় বাবার মুখে ইংরেজদের অত্যাচারের অনেক গল্প শুনেছি। তখন এই জায়গার নাম শুনলেই মানুষ ভয় পেত। আজ সেই জায়গাতেই ইউনিয়ন ভূমি অফিস। আগে যেখানে কৃষকদের ওপর নির্যাতন হতো, এখন সেখানে কৃষকেরাই নিজেদের জমির কাগজপত্রের কাজ করেন। সময়ের ব্যবধানে অনেক কিছু বদলে গেছে।”

তবে প্রায় দুই শতকের পুরোনো এ ভবনটি এখন নিজেই ঝুঁকিতে রয়েছে। সময়ের ভারে ভবনের ছাদ ও দেয়ালের বিভিন্ন অংশে ফাটল দেখা দিয়েছে। কোথাও কোথাও পলেস্তারা খসে পড়েছে। মূল কাঠামো এখনো টিকে থাকলেও দ্রুত সংস্কার ও সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া না হলে ঐতিহাসিক এ স্থাপনাটি অদূর ভবিষ্যতে হারিয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা স্থানীয়দের।

ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, দৌলতপুর উপজেলার মহিষকুণ্ডি, পচামাদিয়া ও হোসেনাবাদ এলাকাতেও একসময় একাধিক নীলকুঠি ছিল। এসব নীলকুঠি থেকে নীলের ব্যবসা পরিচালিত হতো। কিন্তু যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে একে একে সেগুলো বিলীন হয়ে গেছে। বর্তমানে হোসেনাবাদ ও মহিষকুণ্ডিতে নতুন ভবনে ইউনিয়ন ভূমি অফিস পরিচালিত হলেও অতীতের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো আর টিকে নেই। প্রবীণদের স্মৃতি ও কিছু ধ্বংসাবশেষই কেবল সেই ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করছে।

দৌলতপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) প্রদীপ কুমার দাশ বলেন, “বর্তমানে ভবনটি ইউনিয়ন ভূমি অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ভবনটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় রেখে সংরক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সংস্কারের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। উপজেলার চারটি নীলকুঠির মধ্যে তিনটি স্থানে বর্তমানে ভূমি অফিস পরিচালিত হচ্ছে।”

ইতিহাস শুধু বইয়ের পাতায় থাকে না; পুরোনো স্থাপনা, বৃক্ষ, মানুষের স্মৃতি আর সময়ের নীরবতাতেও তার অস্তিত্ব টিকে থাকে। সোনাইকুণ্ডির নীলকুঠি সেই ইতিহাসেরই এক জীবন্ত দলিল। যে ভবন একসময় ঔপনিবেশিক শোষণের প্রতীক ছিল, সময়ের পরিবর্তনে আজ সেটিই হয়ে উঠেছে সাধারণ মানুষের সরকারি সেবা পাওয়ার ঠিকানা। তাই ইতিহাসের এই গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শনটি সংরক্ষণ করা শুধু একটি পুরোনো ভবন রক্ষা নয়, বরং আগামী প্রজন্মের জন্য অতীতকে ধরে রাখারও দায়িত্ব।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।