সোহেল রানা বাবু, বাগেরহাট প্রতিনিধি
বাবা-মাকে হারিয়েও থেমে যায়নি অদম্য মেধাবী অরিত্র সরকার। চরম দারিদ্র্য ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের প্রচেষ্টায় এবারের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে সে। বাগেরহাট শহরের আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে পরীক্ষায় অংশ নিয়ে এই সাফল্য অর্জন করেছে অরিত্র।
কোনো প্রাইভেট বা কোচিং ছাড়াই নিয়মিত ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পড়াশোনা করে এমন ফলাফল করেছে সে। ভবিষ্যতে প্রকৌশলী হয়ে বাবা-মায়ের স্বপ্ন পূরণ করতে চায় অরিত্র। তবে উচ্চশিক্ষার খরচ চালিয়ে যাওয়া নিয়ে এখন দুশ্চিন্তায় রয়েছে সে। তার স্বপ্ন পূরণে সরকার ও সমাজের বিত্তবানদের সহযোগিতা কামনা করেছেন স্বজন, শিক্ষক ও প্রতিবেশীরা।
বাগেরহাট শহরের শালতলা এলাকার একটি ছোট টিনশেড ঘরে দুই ভাইয়ের বসবাস। অরিত্র ছোট। তার বাবা উৎপল সরকার টোলকু বাড়ির সামনে একটি চা ও পান বিক্রির দোকান করতেন। সেই দোকানের আয়েই চলত তাদের সংসার।
২০২২ সালে হঠাৎ বাবার মৃত্যুতে পরিবারটি বিপাকে পড়ে। এর দুই বছর পর ২০২৪ সালে অরিত্রর বড় ভাই অর্ণবের এসএসসি পরীক্ষা চলাকালে মা নমিতা সরকারও মারা যান। মাত্র চার বছরের ব্যবধানে বাবা-মাকে হারিয়ে দুই ভাই হয়ে পড়ে পিতৃমাতৃহীন।
অভাব-অনটনের কারণে তাদের লেখাপড়াও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। তবে হাল ছাড়েনি দুই ভাই। আত্মীয়স্বজনের সহযোগিতা এবং নিজেদের উপার্জনের মাধ্যমে তারা পড়াশোনা চালিয়ে যায়। বাবার রেখে যাওয়া দোকানটি অর্থাভাবে ভাড়া দিতে না পারায় একসময় বন্ধ হয়ে যায়। পড়াশোনার খরচ জোগাতে অরিত্র নিজেও শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট পড়ানো শুরু করে। তবে এসএসসি পরীক্ষার সময় প্রাইভেট পড়ানো বাদ দিয়ে পুরোপুরি পড়াশোনায় মনোযোগ দেয়।
অরিত্র সরকার জানায়, “দারিদ্র্যের কারণে কোনো প্রাইভেট বা কোচিং করতে পারিনি। বাসায় বসেই প্রতিদিন ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পড়াশোনা করেছি। বড় ভাই, আত্মীয়স্বজন ও শিক্ষকদের কাছ থেকে সহযোগিতা পেয়েছি। মা-বাবার স্বপ্ন ছিল আমি প্রকৌশলী হব। তাদের স্বপ্ন পূরণ করতে চাই।”
সে আরও জানায়, ভালো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চায়। কিন্তু উচ্চশিক্ষার খরচ নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছে। সরকার ও সমাজের বিত্তবানরা সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলে তার স্বপ্ন পূরণ সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করে অরিত্র।
অরিত্রর বড় ভাই অর্ণব সরকার বলেন, “ছোট ভাইয়ের সাফল্যে আমি খুবই খুশি। তবে মা-বাবার কথা মনে পড়লে কষ্ট হয়। আমার এসএসসি পরীক্ষা চলার সময় মা মারা যান। মায়ের মৃত্যুর শোক নিয়েই পরীক্ষা দিয়েছি। বাবা-মায়ের স্বপ্ন ছিল ছোট ভাই প্রকৌশলী হবে। ওর পড়াশোনা চালিয়ে নিতে সবার সহযোগিতা চাই।”
প্রতিবেশী গোপাল সাহা বলেন, “বাবা-মা হারানো অরিত্র কোনো প্রাইভেট বা কোচিং ছাড়াই অসাধারণ ফলাফল করেছে। এতে আমরা খুবই আনন্দিত। অরিত্রর মতো মেধাবী ও দরিদ্র শিক্ষার্থীর পড়াশোনা যেন অর্থের অভাবে বন্ধ না হয়, সেজন্য সরকার ও সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসা উচিত।”
অরিত্রর স্বপ্ন এখন শুধু জিপিএ-৫ অর্জনেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিকূলতাকে জয় করে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে প্রকৌশলী হয়ে বাবা-মায়ের স্বপ্ন পূরণ করতে চায় এই অদম্য মেধাবী।

