রাসেল আহমেদ, খুলনা প্রতিনিধি
সুন্দরবনের বিভিন্ন খালে স্যাটেলাইট ট্রান্সমিটার পিঠে নিয়ে ছেড়ে দেওয়া পাঁচ কুমির প্রায় এক হাজার ৪৬ কিলোমিটার নৌপথ ঘুরে বেড়িয়েছে। তবে লবণাক্ত পানির কারণে স্যাটেলাইট ট্রান্সমিটারগুলো নষ্ট হয়ে যাওয়ায় বর্তমানে কুমিরগুলোর অবস্থান জানার কোনো উপায় নেই। বন বিভাগ জানিয়েছে, কুমিরগুলোর সঙ্গে এখন কোনো ধরনের যোগাযোগ রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
গবেষণার শুরু
২০২৪ সালের ১৩ মার্চ প্রথমবারের মতো সুন্দরবনের কুমিরের জীবনাচরণ, চলাচল ও অধিক্ষেত্র সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে শুরু হয় এই গবেষণা। কুমিরের পিঠে স্যাটেলাইট ট্রান্সমিটার বসিয়ে পর্যায়ক্রমে পাঁচটি কুমিরকে বিভিন্ন খালে ছেড়ে দেওয়া হয়। কুমিরগুলোর নামকরণ করা হয়—জুলিয়েট, মধু, পুটিয়া, জোংড়া ও হারবারিয়া।
এর মধ্যে জুলিয়েট, মধু ও পুটিয়া ছিল স্ত্রী কুমির, আর জোংড়া ও হারবারিয়া ছিল পুরুষ। স্যাটেলাইট ট্রান্সমিটার যুক্ত করে এসব কুমিরকে ভদ্রা, হারবারিয়া, জোংড়া ও চরপুটিয়া খালে ছাড়া হয়।
কে কত দিন ট্র্যাক করা গেছে?
যুক্তরাষ্ট্রের ‘ওয়াইল্ডলাইফ কম্পিউটারস’ নামের প্রতিষ্ঠান তৈরি করা ট্রান্সমিটারগুলো শুরুতে ভালোই কাজ করলেও পরবর্তী সময়ে একে একে অকার্যকর হয়ে পড়ে। ট্রান্সমিটারগুলো যে কয়দিন সচল ছিল—
জুলিয়েট: ৭১ দিন,মধু: ১২৭ দিন,পুটিয়া: ৮৩ দিন,হারবারিয়া: ৫২ দিন,জোংড়া: ৬৪ দিন
সর্বশেষ তথ্য পাওয়া যায় ২০২৫ সালের ১৯ এপ্রিল, পুটিয়া নামের কুমিরটির কাছ থেকে। এর আগে গত বছর জুলাই মাসেই বাকি চার কুমিরের ট্রান্সমিটার বন্ধ হয়ে যায়।
কুমিরের বিচরণ কত দূর?
স্যাটেলাইট ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে গবেষণায় দেখা গেছে, পাঁচ কুমিরের মোট ঘোরাফেরার দূরত্ব ছিল প্রায় ১ হাজার ৪৬ কিলোমিটার। কুমিরভেদে ঘোরাফেরা ছিল এ রকম—
জুলিয়েট: ১৪৫ কিমি,মধু: ১৭০ কিমি,পুটিয়া: ২০৪ কিমি,হারবারিয়া: ৫১ কিমি,জোংড়া: ৪৭৩ কিমি
জোংড়া নামের পুরুষ কুমিরটি সুন্দরবনের বাইরে বাগেরহাট, বরিশাল ও পিরোজপুর জেলা পর্যন্ত ঘুরে আবার সুন্দরবনে ফিরে এসেছে। কুমিরগুলো দিনে প্রায় দেড় থেকে দুই কিলোমিটার পথ ঘোরে, যা মূলত খাবার সংগ্রহ ও ডিম পাড়ার স্থান নির্ধারণের সঙ্গে যুক্ত।
গবেষণার লক্ষ্য কী ছিল?
গবেষণার লক্ষ্য ছিল—কুমিরের অধিক্ষেত্র, চলাচলের পরিধি, প্রজনন অভ্যাস ও পরিবেশগত চাহিদা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা। গবেষণায় নেতৃত্ব দেয় আইইউসিএন বাংলাদেশ, আর্থিক সহায়তা দেয় জার্মান ফেডারেল মিনিস্ট্রি ফর ইকোনমিক কোঅপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট। এটি পরিচালিত হয় ‘ইন্টিগ্রেটেড ম্যানেজমেন্ট অব সুন্দরবন ম্যানগ্রোভস অ্যান্ড দ্য মেরিন প্রটেকটেড এরিয়া সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড বাংলাদেশ’ প্রকল্পের আওতায়।
আইইউসিএনের প্রোগ্রাম ম্যানেজার এ বি এম সরোয়ার আলম দীপু বলেন, নোনাপানির কুমির নিয়ে স্যাটেলাইট ট্র্যাকিং এই প্রথম। আমরা ধারণা করেছিলাম ৬০-৭০ দিন পর্যন্ত তথ্য পাওয়া যাবে। কিন্তু কিছু ট্রান্সমিটার প্রত্যাশার চেয়েও বেশি সময় চলেছে।
বন বিভাগের খুলনা অঞ্চলের বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা নির্মল কুমার পাল বলেন,এ ধরনের গবেষণার আগে কুমিরের চলাফেরা, অধিক্ষেত্র, এক জায়গায় কত সময় থাকে—এসব বিষয়ে আমাদের খুব একটা ধারণা ছিল না। এখন আমরা অনেক নতুন তথ্য পেয়েছি।
ভবিষ্যতের পরিকল্পনা
গবেষণা দলের সদস্যরা জানিয়েছেন, লবণাক্ত পরিবেশে আরও কার্যকর স্যাটেলাইট ডিভাইস ব্যবহার করে ভবিষ্যতে কুমির পর্যবেক্ষণের নতুন উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া সুন্দরবনের বাইরে কুমির যায় কি না, তারও দীর্ঘমেয়াদি ট্র্যাকিং জরুরি বলে মনে করছেন তারা।

