জয়পুরহাট প্রতিনিধি
জয়পুরহাটের কালাই উপজেলায় সরকারের গৃহহীন ও ভূমিহীনদের জন্য নির্মিত আশ্রয়ণ প্রকল্পে নানা অনিয়ম ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ উঠেছে। সংযোগহীনতা, অব্যবস্থাপনা ও তদারকির অভাবে অনেক ঘর এখন মাদকসেবী ও অসামাজিক কার্যকলাপের আস্তানায় পরিণত হয়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পের ঘরগুলো কাগজে-কলমে প্রকৃত অসহায়দের নামে বরাদ্দ দেওয়া হলেও বাস্তবে সেগুলোর বড় অংশ ভাড়াটিয়া, জবরদখলকারী এবং মাদক কারবারিদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। এতে সরকারের মহৎ উদ্যোগ প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে এবং প্রকৃত উপকারভোগীরা বঞ্চিত হচ্ছেন।
সরেজমিনে জানা যায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে কালাই উপজেলায় দুটি প্রকল্পে মোট ১৫৯টি ঘর নির্মাণ করা হয়। এর মধ্যে ১১৯টি সেমিপাকা এবং ৪০টি টিনশেড ঘর। মাত্রাই ইউনিয়নের কাঁটাহার আশ্রয়ণ প্রকল্পের ৫৮টি ঘর এক প্রভাবশালী ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়রা জানান, সেখানে প্রকাশ্যে মাদক কেনাবেচা ও সেবন চলছে।
একই প্রকল্পের উপকারভোগী রোকেয়া বেগম, রজ্জব আলী ও ছাইদুর রহমান অভিযোগ করেন, মাদকসেবীরা অনেক ঘর জবরদখল করে রেখেছে। এছাড়া ৫৫ নম্বর ঘরের উপকারভোগী নুরনবী-কুলসুম দম্পতিকে ৬০ হাজার টাকার বিনিময়ে উচ্ছেদের অভিযোগ উঠেছে এক ইউপি সদস্যের বিরুদ্ধে।
উদয়পুর ইউনিয়নের বিনইল ও উত্তরপাড়ার আশ্রয়ণ প্রকল্পেও বহিরাগতদের আনাগোনা, মাদকসেবন ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে বলে জানা গেছে। স্থানীয়রা জানান, বিনইলে দুটি ঘর প্রায় ৮০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে। শ্রীপুর আশ্রয়ণ প্রকল্পে স্বচ্ছল প্রবাসী পরিবারের বসবাস এবং অনেক ঘর তালাবদ্ধ থাকার ঘটনাও পাওয়া গেছে।
এছাড়া জিন্দারপুর, ঘাটুরিয়া ও বাদাউচ্চ এলাকার আশ্রয়ণ প্রকল্পের ৬৩টি ঘরের অধিকাংশই ভাড়া বা বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। পাইকপাড়া ও লকইর প্রকল্পের প্রায় ২২টি ঘরের মধ্যে অন্তত ১০টির উপকারভোগীরা জেলা শহরে বসবাস করছেন, আর বাকি ঘরগুলো প্রভাবশালীদের দখলে রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
তালোড়া বাইগুনী পীরপুকুর আশ্রয়ণ প্রকল্পেও একই চিত্র দেখা গেছে। এখানে ১৫৯টি ঘরের মধ্যে প্রায় ৮০টি ভাড়াটিয়াদের দখলে। কর্মসংস্থানের অভাবে অনেক উপকারভোগী অন্যত্র চলে যাওয়ায় ফাঁকা ঘরগুলো মাদকসেবীদের আড্ডাখানায় পরিণত হয়েছে।
বাসিন্দারা জানান, অনেক স্থানে যাতায়াতের রাস্তা নেই, বর্ষায় পানি জমে, ঘরের দেয়ালে ফাটল দেখা দিয়েছে এবং সুপেয় পানির সংকট রয়েছে। পাশাপাশি রাতের বেলা মাদক কারবারিদের উৎপাত বেড়ে যাওয়ায় নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন তারা।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, স্থাপিত নলকূপের বেশিরভাগই চুরি হয়ে গেছে এবং অবশিষ্ট পানিতেও আয়রনের মাত্রা বেশি থাকায় তা ব্যবহার অনুপযোগী। নতুন নলকূপ স্থাপন ও নিরাপত্তা জোরদারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
কালাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম বলেন, এ বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ পাওয়া যায়নি। তবে বিষয়টি খতিয়ে দেখে সত্যতা পাওয়া গেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামীম আরা জানান, আশ্রয়ণ প্রকল্পে জবরদখল, ভাড়া ও বিক্রির অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নিয়ম ভঙ্গকারীদের বরাদ্দ বাতিল করে প্রকৃত গৃহহীনদের মধ্যে পুনর্বণ্টন করা হবে এবং মাদকসহ যেকোনো অসামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

