দৌলতপুর (কুষ্টিয়া) প্রতিনিধি
ভুল চিকিৎসা, রোগ নির্ণয়ে গাফিলতি, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং চিকিৎসকের পরিবর্তে আয়া ও নার্স দিয়ে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার অভিযোগে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে তানিম প্রাইভেট হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার বন্ধের দাবিতে অনশন কর্মসূচি পালন করেছেন এলাকাবাসী।
রোববার (১৬ আগস্ট) দুপুর ২টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত উপজেলার প্রাগপুর ইউনিয়নের মহিষকুন্ডি এলাকায় অবস্থিত প্রতিষ্ঠানটির সামনে এ কর্মসূচি পালিত হয়। এতে স্থানীয় বাসিন্দা, ভুক্তভোগী রোগীর স্বজনসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।
অনশনে অংশ নেওয়া ভুক্তভোগী ও স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, তানিম প্রাইভেট হাসপাতালে যথাযথ পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও রোগ নির্ণয় ছাড়াই চিকিৎসা দেওয়া হয়। পাশাপাশি অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে চিকিৎসাসেবা পরিচালনা এবং চিকিৎসকের পরিবর্তে আয়া ও নার্স দিয়ে রোগীদের চিকিৎসা দেওয়ার অভিযোগও করেন তারা।
তাদের দাবি, চিকিৎসাসেবার মতো স্পর্শকাতর ক্ষেত্রে এ ধরনের অনিয়ম অব্যাহত থাকলে সাধারণ রোগীদের জীবন মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে। তাই অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে আইনানুগ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ রাখার দাবি জানান তারা।
অনশনে পাকুড়িয়া গ্রামের আরিফুর রহমানের মেয়ে মোছা. জান্নাতির চিকিৎসার বিষয়টি তুলে ধরা হয়। পরিবারের অভিযোগ, পেটে ব্যথা নিয়ে জান্নাতিকে তানিম প্রাইভেট হাসপাতালে নেওয়া হলে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তার পেটে পাথর রয়েছে বলে জানানো হয়। পরে তাকে ভর্তি করে পাথর নির্ণয়ের ওষুধ সেবন করানো হয় বলে পরিবারের দাবি।
পরবর্তীতে জান্নাতির শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরিবারের সদস্যদের দাবি, সেখানে পুনরায় পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর অ্যাপেন্ডিসাইটিসজনিত সমস্যা শনাক্ত হলে তার অস্ত্রোপচার করা হয়। পরে জান্নাতি সুস্থ হয়ে ওঠেন বলে জানান স্বজনরা।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, ওই প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা নিতে গিয়ে ভুল চিকিৎসার কারণে প্রসূতিসহ একাধিক রোগীর মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। গত কয়েক বছরে এ ধরনের ঘটনায় প্রায় ৫ থেকে ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করেন তারা। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অনশনে অংশ নেওয়া এলাকাবাসী বলেন, চিকিৎসার নামে কোনো প্রতিষ্ঠানে রোগীর জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার সুযোগ নেই। তারা দ্রুত অভিযোগ তদন্ত, রোগীদের চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথিপত্র যাচাই, প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন এবং চিকিৎসাসেবার মান পর্যালোচনার দাবি জানান। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন তারা।
এ বিষয়ে দৌলতপুর উপজেলা ক্লিনিক মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আতিয়ার রহমান বলেন, “একটি শিশুর ভুল চিকিৎসার বিষয়টি আমরা শুনেছি। আমার জানামতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর কর্তৃপক্ষ যে সিদ্ধান্ত নেবে, আমরা তার সঙ্গে সহমত পোষণ করব।”
দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তৌহিদুল হাসান তুহিন বলেন, “সংবাদমাধ্যমে ক্লিনিকটির বিষয়ে জানতে পেরেছি। পরবর্তীতে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটি আগামীকাল প্রতিবেদন দিলে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এদিকে, ভুল চিকিৎসা, রোগ নির্ণয়ে গাফিলতি ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের মতো গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে তদন্ত প্রতিবেদনই এখন গুরুত্বপূর্ণ। সংশ্লিষ্টদের মতে, রোগীদের চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথিপত্র, প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন, চিকিৎসাসেবার মান ও রোগ নির্ণয় পদ্ধতি যাচাইয়ের পরই অভিযোগগুলোর সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

