মো.ইব্রাহীম মিঞা, দিনাজপুর প্রতিনিধি
দিনাজপুরের বিরামপুর পৌর শহরসহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বেওয়ারিশ কুকুরের দলবদ্ধ চলাচলে আতঙ্ক বাড়ছে। বিশেষ করে পৌর শহরের বড় মাঠ ও আশপাশের সড়কে একসঙ্গে ১৫ থেকে ২০টি কুকুর নিয়মিত ঘোরাফেরা করছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। এতে শিশু, শিক্ষার্থী, বয়স্ক ও একাকী পথচারীদের চলাচলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বড় মাঠের পাশেই রয়েছে বিরামপুর পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়, মহিলা কলেজ ও কয়েকটি কিন্ডারগার্টেন। সকাল ও ছুটির সময়ে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের যাতায়াত বেশি থাকায় কুকুরের দল নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যে বাড়তি উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, কখনো কখনো কুকুরের দল পথচারীদের পিছু নেয় বা তেড়ে আসার মতো পরিস্থিতি তৈরি করে।
স্থানীয়রা জানান, শুধু পৌর শহর নয়, উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের গ্রাম ও জনবসতিপূর্ণ এলাকাতেও বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা ও দলবদ্ধ চলাচল বেড়েছে। ফলে বিষয়টি জননিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সমস্যা হয়ে উঠেছে।
বিরামপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর ও ভেটেরিনারি হাসপাতালের ভেটেরিনারি সার্জন ডা. কুমার জ্যোতির্ময় রায় বলেন, কুকুরের কামড়ে আহত ছাগল ও ভেড়া প্রতি মাসে গড়ে ৮ থেকে ৯টি চিকিৎসার জন্য আসে। এর মধ্যে বছরে দুই-তিনটি গুরুতর অবস্থায় আসে। কোনো কোনো প্রাণীর মেরুদণ্ড ভেঙে যায় কিংবা গলা ও শরীরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে কামড়ের কারণে তাদের বাঁচানো সম্ভব হয় না।
বিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. শাহরিয়ার পারভেজ বলেন, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত কুকুর, বিড়াল ও শিয়ালের কামড়ে প্রায় ১ হাজার ৩০০ রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। এর মধ্যে আনুমানিক ৪০০ থেকে ৫০০ জন কুকুরের কামড়ের শিকার। প্রতি মাসে গড়ে ১৮০ থেকে ২০০ জন এসব প্রাণীর কামড়ের ঘটনায় চিকিৎসা নিতে আসছেন।
তিনি বলেন, প্রয়োজন অনুযায়ী রোগীদের চিকিৎসা ও জলাতঙ্ক প্রতিরোধী টিকা দেওয়া হচ্ছে। তবে কামড়ের ঘটনা কমাতে জনসচেতনতার পাশাপাশি বেওয়ারিশ কুকুর ব্যবস্থাপনায় কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সুব্রত কুমার সেন বলেন, কুকুরের কামড়ের রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। তাই মানুষকে সচেতন করার পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ ও অসুস্থ কুকুর শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় টিকাদানের আওতায় আনা জরুরি। কুকুর নিধনের পরিবর্তে প্রচলিত আইন ও আদালতের নির্দেশনা অনুসরণ করে মানবিক পদ্ধতিতে কুকুর ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
স্থানীয়দের দাবি, বেওয়ারিশ কুকুর নিধন কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। অসুস্থ ও আক্রমণাত্মক কুকুর শনাক্তকরণ, জলাতঙ্ক প্রতিরোধী টিকাদান, বন্ধ্যাকরণ, চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
স্থানীয়রা জানান, ২০১৮ সালের দিকে বেওয়ারিশ কুকুরকে টিকা দেওয়ার পর গায়ে লাল রং দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছিল। এরপর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এ ধরনের কার্যক্রম আর দৃশ্যমান হয়নি। বিভিন্ন সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও পৌর কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে বলে জানান তারা।
তাদের মতে, পৌর শহরের পাশাপাশি উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে জরিপ চালিয়ে বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা, অবস্থান ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা দরকার। বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বাজার, হাসপাতাল, খেলার মাঠ ও অন্যান্য জনবহুল এলাকায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
এ বিষয়ে বিরামপুর পৌর প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোছাঃ তানজিনা খাতুন বলেন, জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে মাইকিংসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, জননিরাপত্তা ও প্রাণিকল্যাণ—দুই দিক বিবেচনায় নিয়ে বিরামপুর পৌর শহরসহ পুরো উপজেলায় বেওয়ারিশ কুকুর ব্যবস্থাপনায় নিয়মিত, পরিকল্পিত ও মানবিক কার্যক্রম চালু করা হবে।

