আগৈলঝাড়া (বরিশাল) প্রতিনিধি
একই স্কুল মাঠের পশ্চিম পাশে মসজিদে জামাতে নামাজ আদায় করছেন মুসল্লিরা, আর পূর্ব পাশে মন্দিরে চলছে শারদীয় দুর্গাপূজার আয়োজন। মাঝখানের মাঠে হিন্দু-মুসলিম শিশুরা মেতে উঠেছে ফুটবল খেলায়। নামাজের সময় মন্দিরের মাইক ও বাদ্যযন্ত্র বন্ধ রাখা হচ্ছে। এভাবেই পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহযোগিতা ও সম্প্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার পূর্ব বাগধা দাসপাড়া গ্রাম।
মঙ্গলবার বিকেলে উপজেলার বাগধা ইউনিয়নের পূর্ব বাগধা দাসপাড়া সার্বজনীন দুর্গামন্দিরে গিয়ে দেখা যায়, বাগধা দাসপাড়া এসইএসডিপি মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মাঠের পশ্চিম প্রান্তে ইউনিয়ন পরিষদসংলগ্ন বাইতুল আমান জামে মসজিদ। মাঠের পূর্ব পাশে দুর্গামন্দির। আসরের আজানের আগেই মন্দিরের মাইক ও বাদ্যযন্ত্র বন্ধ করে দেওয়া হয়। আজানের পর মুসল্লিরা মসজিদে প্রবেশ করে জামাতে নামাজ আদায় করেন। অন্যদিকে, মন্দিরে চলে দুর্গাপূজার ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা।
মসজিদ ও মন্দিরের মাঝের মাঠে ফুটবল খেলছিল বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। আবির ইদ্রিস, অর্ক মণ্ডল, আত্তাহি বক্তিয়ার, আবু হানিফ মোল্লা, অঙ্কন দাস, মুমিন তাজ, নীরব বাড়ৈ, আবিদ বক্তিয়ার, জয়দেব দাস, সালমান হাওলাদার ও স্বাধীন মণ্ডলসহ অনেক শিশুকে একসঙ্গে খেলতে দেখা যায়। তাদের খেলাধুলায় ধর্মীয় পরিচয়ের কোনো ভেদাভেদ নেই। প্রতিদিনই তারা এ মাঠে মিলেমিশে খেলাধুলা করে।
মন্দিরে চলছিল পূজা-অর্চনা, ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি ও আরতি। পূজা শেষে ভক্তদের মধ্যে বিতরণ করা হয় প্রসাদ। পাশাপাশি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করেন এলাকার নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোরসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষ। দূরদূরান্ত থেকেও অনেকে পরিবার নিয়ে আসেন পূজার আয়োজন ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান দেখতে।
মাঠের আশপাশেও রয়েছে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। মসজিদের পাশে পূর্ব বাগধা দাসপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাঠের কাছে মাধ্যমিক বিদ্যালয়, বাগধা ইউনিয়ন পরিষদ ভবন এবং নিবন্ধিত একটি ক্লাব। একই এলাকায় এসব প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় স্থাপনা পাশাপাশি অবস্থান করলেও পারস্পরিক সম্প্রীতি বজায় রেখেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
বাগধা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম বাবুল ভাট্টি বলেন, ইউনিয়ন পরিষদসংলগ্ন এলাকায় মসজিদ, মন্দির, স্কুল ও নিবন্ধিত ক্লাব রয়েছে। তাঁর ২৪ বছরের চেয়ারম্যান থাকাকালে এসব স্থাপনার অধিকাংশ নির্মিত হয়েছে। একই মাঠের দুই প্রান্তে মসজিদ ও মন্দিরে নিজ নিজ ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য বজায় রেখে অনুষ্ঠান হচ্ছে। এটি এলাকার মানুষের জন্য গর্বের বিষয়।
স্থানীয় মুসল্লি খলিল মিয়া বলেন, “এলাকার হিন্দু-মুসলিম সবাই পাশাপাশি বাড়িতে মিলেমিশে বসবাস করি। একই মাঠে মসজিদ ও মন্দির থাকায় আমরা নির্বিঘ্নে নিজ নিজ ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করে আসছি। এ নিয়ে কখনো কারও বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই।”
পূর্ব বাগধা দাসপাড়া সার্বজনীন দুর্গামন্দির কমিটির যুগ্ম সম্পাদক ও পূজার দায়িত্বে থাকা উজ্জ্বল দাস জানান, ১৯৯০ সালে মাঠের পূর্ব পাশে মন্দির প্রতিষ্ঠা করা হয়। পরে ২০০৭ সালে মাঠের পশ্চিম প্রান্তে জামে মসজিদ নির্মিত হয়। এরপর থেকে সবাই পারস্পরিক সহযোগিতার মধ্য দিয়ে নিজ নিজ ধর্ম পালন করে আসছেন। এতে তাঁদের কোনো সমস্যা হচ্ছে না।
মসজিদ, মন্দির, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ইউনিয়ন পরিষদের ভূমিদাতা বিমল দাস বলেন, তাঁর বাবা নিলকান্ত দাস, কাকা রাখাল চন্দ্র দাস ও ভাই কালিপদ দাস এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য জমি দান করেছেন। তাঁদের পরিবার বাপ-দাদার আমল থেকেই হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি ও সুসম্পর্ক বজায় রেখে বসবাস করে আসছে।
স্থানীয় মুসল্লি মো. আলী আজগর হাওলাদার বলেন, “মসজিদে প্রতি ওয়াক্ত নামাজের সময় মন্দিরের মাইক, ঢাক-ঢোলসহ বাদ্যযন্ত্র বন্ধ রাখা হয়। আমরাও মন্দিরে পূজা-অর্চনার সময় সহযোগিতা করি। এটাই আমাদের ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের নিদর্শন।”
স্থানীয়দের মতে, ধর্মীয় আচার পালনের ক্ষেত্রে একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা, সহযোগিতা ও সহনশীলতার এই চর্চা শুধু পূর্ব বাগধা দাসপাড়া গ্রামের নয়, বরং অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের জন্যও এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

