মাদারীপুর প্রতিনিধি
ইতালিতে একটি ভালো ভবিষ্যতের আশায় বাড়ি ছেড়েছিলেন মাদারীপুর সদর উপজেলার কুনিয়া ইউনিয়নের ত্রিভাগদী গ্রামের শাজাহান হাওলাদার। কিন্তু সেই স্বপ্ন আজ বিভীষিকা। মাফিয়ার হাতে জিম্মি হয়ে পরিবার থেকে আদায় করা হয়েছে অন্তত ৩৮ লাখ টাকা। এরপর দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও তার আর কোনো খোঁজ নেই। দিশেহারা পরিবার, হতাশ মা-বাবা, কান্নায় ভেঙে পড়েছেন স্ত্রী-সন্তান।
সরেজমিন বৃহস্পতিবার বিকেলে জানা যায়, শাজাহান হাওলাদারকে ইতালিতে পাঠানোর প্রলোভন দেখায় একই গ্রামের মৃত বারেক বেপারীর ছেলে আমির বেপারী। মানবপাচার চক্রের সক্রিয় সদস্য হিসেবে পরিচিত আমির ২০২২ সালের ২ জুলাই শাজাহানকে প্রথমে পাঠান দুবাই। পরে মিশর ঘুরিয়ে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় লিবিয়ায়। সেখানেই ঘটে বিপত্তি—লিবিয়ার মাফিয়ারা শাজাহানকে জিম্মি করে অমানবিক নির্যাতন শুরু করে। ধাপে ধাপে মুক্তিপণ হিসেবে আদায় করা হয় প্রায় ৩৮ লাখ টাকা।
শেষবার ২০২৪ সালের ২১ মার্চ পরিবারের সঙ্গে কথা বলার পর থেকেই নিখোঁজ শাজাহান। এরপর তার পরিবার ২০২৪ সালের ২৪ নভেম্বর মাদারীপুর আদালতে মানবপাচার আইনে একটি মামলা দায়ের করে। তবে অভিযোগ রয়েছে, মামলার পর উল্টো দালাল আমির বেপারী ওই পরিবারকে মিথ্যা মামলায় হয়রানি করছে।
শাজাহানের বাবা রহিম হাওলাদার বলেন, “আমার ছেলেকে ইতালি নেওয়ার কথা বলে লিবিয়ায় আটকে রেখে দফায় দফায় টাকা আদায় করেছে আমির। সব মিলিয়ে দিয়েছি ৩৮ লাখ টাকা। এখন দেড় বছর ধরে আমার ছেলের খোঁজ নেই। আমরা সরকারের কাছে অনুরোধ করছি—আমার ছেলেকে উদ্ধার করা হোক এবং দালালের বিচার হোক।”
শাজাহানের ভাবী শিল্পী বেগম বলেন, “তার স্ত্রী, ছোট সন্তান, বৃদ্ধ মা-বাবা অসহায় অবস্থায় আছে। পরিবার আজ নিঃস্ব। সরকারের হস্তক্ষেপ ছাড়া এই চক্র থেকে কারও মুক্তি নেই।”
স্থানীয়রাও মানবপাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তারা বলেন, “শাজাহানকে লিবিয়ায় বন্দি করে যেভাবে টাকা আদায় করা হয়েছে, তা একেবারেই অমানবিক ও অপরাধমূলক। অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত।”
অভিযুক্ত আমির বেপারী অবশ্য সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “আমি শাজাহান নামে কাউকে চিনি না। আমার নামে মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছে।”
এ বিষয়ে মাদারীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “নিখোঁজ শাজাহান হাওলাদারের পরিবারের করা মামলা তদন্তাধীন। কোনো পক্ষ যেন অপরপক্ষকে হয়রানি করতে না পারে, সে বিষয়েও পুলিশ সচেতন রয়েছে।”
মানবপাচারের এমন মর্মান্তিক ঘটনায় প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকা এবং সরকারের আন্তরিক হস্তক্ষেপ কামনা করছে শাজাহানের পরিবার ও এলাকাবাসী।

