নান্দাইল (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি
ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার সিংরইল ইউনিয়নের নারায়ণপুর উত্তর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী উপস্থিতি, উপবৃত্তি বিতরণ এবং হাজিরা খাতা নিয়ে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। বিদ্যালয়ের নথিতে ১২৩ জন শিক্ষার্থী থাকলেও প্রতিদিন গড়ে মাত্র ৮ থেকে ১০ জন শিক্ষার্থী শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত থাকে। অথচ হাজিরা খাতায় শতভাগ উপস্থিতি দেখানো হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে সরেজমিনে বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, পাঁচজন শিক্ষক কর্মরত থাকলেও উপস্থিত রয়েছে মাত্র চারজন শিক্ষার্থী। তারা শিশু ও দ্বিতীয় শ্রেণির। প্রায় এক ঘণ্টা অবস্থান করেও অন্য কোনো শ্রেণির শিক্ষার্থীর দেখা মেলেনি।
স্থানীয়দের দাবি, দুই শিফট মিলিয়ে প্রতিদিন গড়ে আট থেকে ১০ জনের বেশি শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে আসে না। তবে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সায়েম উদ্দিন দাবি করেন, বৃষ্টিপাত ও কাঁচা রাস্তায় কাদা থাকার কারণে সেদিন উপস্থিতি কম ছিল।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, পাশের দারুস সালাম মাদরাসায় একই সময়ে এই বিদ্যালয়ের হাজিরা খাতাভুক্ত অন্তত ১৫ জন শিক্ষার্থী ক্লাস করছে। মাদরাসার এক শিক্ষক জানান, মাসিক ২০০ টাকা বেতনে শিক্ষার্থীরা স্বেচ্ছায় সেখানে পড়াশোনা করছে।
এ ছাড়া আরও চারজন শিশুর সন্ধান পাওয়া যায়, যাদের নাম সরকারি বিদ্যালয়ের তালিকায় থাকলেও তারা সেখানে যায় না। তারপরও তারা নিয়মিত উপবৃত্তির টাকা পাচ্ছে বলে জানিয়েছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বিদ্যালয়ে নিয়মিত পাঠদান হয় না এবং শ্রেণিকক্ষে বসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই।
বিদ্যালয়ের নথি অনুযায়ী, মোট ১২৩ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৬১ জন উপবৃত্তি পাচ্ছে। কিন্তু বাস্তব উপস্থিতির সঙ্গে এ তথ্যের বড় ধরনের অসঙ্গতি থাকায় উপবৃত্তি বিতরণ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
বিদ্যালয়টির অবকাঠামোগত অবস্থাও অত্যন্ত নাজুক। বর্তমানে যে ভবনে পাঠদান চলছে, তার তিনটি কক্ষের দেয়াল ও ছাদের পলেস্তরা খসে পড়ছে। দুটি কক্ষ সম্পূর্ণ ব্যবহার অনুপযোগী। একটি কক্ষের মাত্র ১২টি বেঞ্চ ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে ব্যবহার করে পাঠদান চালানো হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিদ্যালয়ের পাশেই কয়েক বছর আগে নির্মাণ শুরু হওয়া একটি দ্বিতল ভবনের কাজ শেষের পথে থাকলেও এখনো সেটি বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি।
একাধিক অভিভাবক বলেন, বিদ্যালয়ে নিয়মিত পাঠদান না হওয়ায় তারা সন্তানদের অন্য স্কুল ও মাদরাসায় ভর্তি করাতে বাধ্য হয়েছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অভিভাবক বলেন, “পড়াশোনার পরিবেশ না থাকায় অনেকেই সন্তানদের অন্য প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করাচ্ছেন।”
এ বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সায়েম উদ্দিন বলেন, “নানা কারণে শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে আসতে চায় না। আমাদের চেষ্টা আছে।” সর্বশেষ কবে সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা বিদ্যালয় পরিদর্শনে এসেছিলেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “প্রায় চার মাস আগে।”
হাজিরা খাতায় শতভাগ উপস্থিতি দেখানোর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এটা আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। উপবৃত্তি দিতে গিয়ে একটু-আধটু এদিক-সেদিক করতে হয়।”
উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা (এটিইও) সালমা বেগম বলেন, “শিক্ষকরা প্রতিদিন হোয়াটসঅ্যাপে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির তথ্য পাঠান। তারপরও কেন এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।”
নান্দাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাতেমা জান্নাত বলেন, “অভিযোগ তদন্ত করে দেখা হবে। সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে বিদ্যালয়ে শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”প্রয়োজনে এটি জাতীয় দৈনিকের রিপোর্টিং স্টাইলে আরও সংক্ষিপ্ত বা অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের আকারেও সাজিয়ে দিতে পারি।

