মনিরামপুর (যশোর) প্রতিনিধি
ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক, বিশিষ্ট কৃষক নেতা, লোকশিল্পী, গীতিকার ও আজীবন সংগ্রামী রণজিৎ বাওয়ালীর মৃত্যুতে যশোরের অভয়নগরে শোকসভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
রোববার (১৬ আগস্ট) বিকেল ৩টায় অভয়নগরের মশিয়াহাটি মন্দির প্রাঙ্গণে এ শোকসভার আয়োজন করা হয়। ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক গাজী আব্দুল হামিদের সভাপতিত্বে সভার শুরুতে রণজিৎ বাওয়ালীর স্মরণে পুষ্পমাল্য অর্পণ করা হয়। পরে তাঁর লেখা ‘জাগো কৃষক, জাগো শ্রমিক…’ গানটি গণসংগীত হিসেবে পরিবেশনের মধ্য দিয়ে সভার কার্যক্রম শুরু হয়।
ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটিসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠন, এলাকার গুণীজন এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ রণজিৎ বাওয়ালীর প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
সভায় রণজিৎ বাওয়ালীর জীবন ও সংগ্রাম নিয়ে আলোচনা করেন ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির উপদেষ্টা ইকবাল কবির জাহিদ। তিনি বলেন, রণজিৎ বাওয়ালীর মৃত্যুতে সৃষ্ট শোককে শক্তিতে পরিণত করে তাঁর আদর্শ বাস্তবায়নে সংগ্রাম কমিটি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। ভবদহের জলাবদ্ধতা নিরসনে টিআরএম বাস্তবায়ন এবং আমডাঙ্গা খাল সংস্কারে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
এ সময় তিনি আগামী ১ সেপ্টেম্বর জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বিক্ষোভ কর্মসূচি এবং এক মাসের মধ্যে ঢাকায় গোলটেবিল বৈঠকের ঘোষণা দেন।
সভায় আরও বক্তব্য দেন ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির উপদেষ্টা তসলিম উর রহমান, চৈতন্য কুমার পাল, অধ্যাপক অনিল বিশ্বাস, শেখর বিশ্বাস, সাধন বিশ্বাস, মাসুদ হাসান, সাবেক সুন্দলী ইউপি চেয়ারম্যান বিকাশ মল্লিক, মুক্তেশ্বরী আন্দোলনের আহ্বায়ক অনিল বিশ্বাস, ২৭ বিল বাঁচাও আন্দোলনের আহ্বায়ক বাবর আলী গোলদার, হরি-গ্যাংরাইল সংগ্রাম কমিটির নেতা মাহাম্মুদুল হাসান, শিব পদ বিশ্বাস, তীষা চামেলী, চ্যকবসন্তী মণ্ডল, স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা হাবিবুর রহমান হাবিব, রাজু আহমেদ, মহির উদ্দীন, সুকৃতি মণ্ডল, ডা. সুকৃতি বিশ্বাস, আদিত্য কুমার সরকার, সুখেন্দু বিশ্বাস ও কনোজ বিশ্বাসসহ অনেকে।
শোকসভায় রণজিৎ বাওয়ালীর পৌত্র বিপ্রজীত বাওয়ালী তাঁর দাদুর আদর্শ ও সংগ্রামকে এগিয়ে নেওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
ভবদহের মানুষের অধিকার আদায়ে আজীবন সংগ্রাম
রণজিৎ বাওয়ালী যশোরের ভবদহ অঞ্চলের জলাবদ্ধতা নিরসন ও পানি নিষ্কাশন আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। দীর্ঘ প্রায় চার দশক ধরে তিনি ভবদহের পানিবন্দী মানুষের অধিকার আদায় এবং জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধানের দাবিতে আন্দোলন-সংগ্রাম করে আসছিলেন।
‘পানি সরাও, মানুষ বাঁচাও’, ‘অবিলম্বে টিআরএম বাস্তবায়ন কর’, ‘এলাকার সকল নদী ও খাল পুনরুদ্ধার ও অবমুক্ত কর’ এবং ‘আমডাঙ্গা খাল সংস্কার কর’—এসব দাবিতে তিনি দীর্ঘদিন রাজপথে সোচ্চার ছিলেন।
ভবদহের জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধানে জোয়ার-ভাটাভিত্তিক নদী ব্যবস্থাপনা বা টিআরএম বাস্তবায়নের পক্ষে তিনি ছিলেন অন্যতম সোচ্চার কণ্ঠ। নদী-খাল দখল, অপরিকল্পিত মৎস্যঘের এবং পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতার বিরুদ্ধে তিনি বিভিন্ন আন্দোলন, গণসমাবেশ ও নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে সংলাপে অংশ নেন।
দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রাম ও গবেষণার মাধ্যমে তিনি নদী-খাল বিষয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। আন্দোলনের কারণে একসময় চোখের দৃষ্টিশক্তি হারালেও সংগ্রাম থেকে সরে যাননি। তাঁর একটি বহুল উচ্চারিত কথা ছিল—‘চোখ নেই তো কী হয়েছে, মুখ তো আছে।’
লোকশিল্পী ও গীতিকার রণজিৎ
মানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলনের পাশাপাশি রণজিৎ বাওয়ালী ছিলেন লোকশিল্পী ও গীতিকার। সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্ট, বঞ্চনা ও অধিকার আদায়ের আকাঙ্ক্ষা তাঁর গান ও কবিতায় উঠে এসেছে। নিজের লেখা গান ও কবিতার মাধ্যমে তিনি কৃষক-শ্রমিকসহ পিছিয়ে পড়া মানুষের কথা তুলে ধরেছেন।
রণজিৎ বাওয়ালী ১৯৪৩ সালের ২ মার্চ যশোরের অভয়নগর উপজেলার ডুমুরতলা গ্রামে এক দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা আশুতোষ বাওয়ালী ও মা রঙ্গোবালা বাওয়ালী।
গত ১ জুলাই নিজ বাড়িতে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত স্ট্রোকে আক্রান্ত হন তিনি। পরে হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার পর চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ১৫ জুলাই থেকে নিজ বাড়িতে চিকিৎসাধীন ছিলেন। বুধবার (৫ আগস্ট) দুপুর ১টা ২৫ মিনিটে ডুমুরতলার নিজ বাড়িতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৮৩ বছর বয়সে তিনি মারা যান।
ব্যক্তিজীবনেও নানা বেদনাবহ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে এই সংগ্রামী নেতাকে। স্ত্রী কালিদাসী বাওয়ালীর সঙ্গে তাঁর দুই সন্তান—ছেলে বৈদ্যনাথ বাওয়ালী ও মেয়ে শেফালী বাওয়ালী। শারীরিক অসুস্থতায় ২৮ বছর বয়সে ছেলে বৈদ্যনাথ মারা যান। চলতি বছরের ৬ মে তাঁর স্ত্রী কালিদাসী বাওয়ালীও মৃত্যুবরণ করেন।
মৃত্যুকালে রণজিৎ বাওয়ালী পরিবার, স্বজন, সহযোদ্ধা ও অসংখ্য আন্দোলনসঙ্গী রেখে গেছেন। ভবদহের জলাবদ্ধতা নিরসন ও সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে তাঁর দীর্ঘদিনের ভূমিকা স্মরণ করে শোকসভায় বক্তারা তাঁর অসমাপ্ত সংগ্রাম এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

