রিপন হোসেন সাজু, মনিরামপুর (যশোর) প্রতিনিধি
এক সময়ের যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম ‘ডাক বিভাগ’ এখন মানুষের আস্থার সংকটে পড়েছে। সেবার মান নিম্নমুখী হওয়ায় সরকারি কিছু নথিপত্রের আদান-প্রদান ও সঞ্চয়পত্র-সংক্রান্ত কার্যক্রম ছাড়া সাধারণ মানুষ ডাক বিভাগের সেবা থেকে অনেকটাই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। ফলে বেসরকারি বিভিন্ন কুরিয়ার সার্ভিসের দিকে ঝুঁকছেন তারা। সেবা গ্রহীতাদের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা ও অব্যবস্থাপনাই এর অন্যতম কারণ।
মনিরামপুর উপজেলার বিভিন্ন শাখা পোস্ট অফিস ঘুরে দেখা গেছে, অনেক ডাকঘরের ভবন দীর্ঘদিনের সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। কোনো অফিসের ছাদ দিয়ে সামান্য বৃষ্টিতেই পানি পড়ে, আবার কোনো ভবনের দেয়ালে ফাটল ধরেছে এবং খসে পড়ছে পলেস্তারা। ঝুঁকিপূর্ণ এসব ভবনেই চলছে ডাক বিভাগের কার্যক্রম।
স্থানীয়দের মতে, সময়ের সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এলেও ডাক বিভাগের কাঙ্ক্ষিত আধুনিকায়ন হয়নি। দ্রুতগতির বেসরকারি কুরিয়ার সার্ভিস এবং ডিজিটাল যোগাযোগব্যবস্থার সঙ্গে তাল মেলাতে না পারায় ধীরে ধীরে মানুষের আস্থা হারাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিষ্ঠানটি।
ডাক বিভাগের সেবার পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চনার অভিযোগ রয়েছে শাখা পোস্ট অফিসে কর্মরত কর্মচারীদেরও। স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পর্যায়ক্রমে রাজস্ব খাতে নেওয়া হলেও পোস্ট অফিসে কর্মরত এসব কর্মচারীর ভাগ্যের তেমন পরিবর্তন হয়নি।
সুকান্ত ভট্টাচার্যের বিখ্যাত ‘রানার’ কবিতায় উঠে আসা ডাক রানারদের ক্লান্তিকর জীবনসংগ্রামের যেন শেষ নেই। নামমাত্র সম্মানি ভাতা দিয়েই বছরের পর বছর দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন তারা।
বাংলাদেশ গ্রামীণ ডাক কর্মচারী পরিষদ (রেজি. নং-২০৩১) যশোর জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন আকাশ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, জেলার ২৪৯টি শাখা পোস্ট অফিসে ৫৫৩ জন কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন। সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত একটানা দায়িত্ব পালন করেও পোস্টমাস্টার মাসে ৪ হাজার ৪৬৬ টাকা, পিওন ৪ হাজার ৩৫৪ টাকা এবং রানার ৪ হাজার ১৭৭ টাকা সম্মানি পান।
তিনি বলেন, ‘এই সামান্য টাকা দিয়ে পরিবার-পরিজনের মুখে দু’বেলা দু’মুঠো খাবার জোগাড় করাই কঠিন হয়ে পড়ে। এর পরও বছরে কর্মচারীদের কল্যাণ তহবিলের জন্য ৫০০ টাকা করে কেটে নেওয়া হয়। অথচ কোনো কর্মচারী অসুস্থ হলে কিংবা মৃত্যুবরণ করলে কর্তৃপক্ষের কাছে বারবার ধরনা দিয়েও সহযোগিতা পাওয়া যায় না।’
কর্মচারীদের দাবি, এক বুক আশা নিয়ে অনেকে এই পেশায় যোগ দিলেও ভবিষ্যৎ অন্ধকার দেখে মাঝপথে চাকরি ছেড়ে অন্য পেশায় চলে গেছেন। যারা দীর্ঘদিন ধরে ভালো কিছুর আশায় এই পেশা আঁকড়ে রয়েছেন, তাদের অনেকেই জীবন সায়াহ্নে এসে অসুস্থতা ও আর্থিক সংকটে ধুঁকছেন।
দাবি আদায়ে গত বছর এবং চলতি বছরের ৬ জুলাই থেকে টানা ১৩ দিন ধর্মঘট ও কলমবিরতিসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেন কর্মচারীরা। পরে কর্তৃপক্ষের আশ্বাসে কর্মসূচি প্রত্যাহার করা হলেও দীর্ঘদিনেও দাবিগুলোর বাস্তবায়ন হয়নি বলে অভিযোগ তাদের।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে যশোরের ডেপুটি পোস্টমাস্টার জেনারেল মো. হাসানুজ্জামান এবং পোস্টমাস্টার জেনারেল (চলতি দায়িত্ব, খুলনা) কবির আহমেদের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তারা ফোন রিসিভ না করায় এবং পরে খুদেবার্তা পাঠিয়েও সাড়া না পাওয়ায় তাদের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, আধুনিক প্রযুক্তি ও বেসরকারি কুরিয়ার সেবার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে ডাক বিভাগের অবকাঠামো আধুনিকায়ন, সেবার মান বৃদ্ধি এবং কর্মরত কর্মচারীদের ন্যায্য সুযোগ

