রাসেল আহমেদ, খুলনা প্রতিনিধি
বর্ষা এলেই যেন নতুন রূপে সেজে ওঠে খুলনার তেরখাদার ভূতিয়ার বিল। বিস্তীর্ণ জলরাশির ওপর সবুজ পাতার ফাঁকে ফুটে থাকে লাল, গোলাপি ও সাদা পদ্ম-শাপলা। দূর থেকে তাকালে মনে হয়, স্বচ্ছ জলের ওপর কেউ যেন বিছিয়ে দিয়েছে ফুলের রঙিন চাদর। আর এই অপরূপ দৃশ্যের টানে প্রতিদিনই বিলপাড়ে ভিড় করছেন প্রকৃতিপ্রেমী ও ভ্রমণপিপাসুরা।
বর্ষার মেঘলা আকাশে ভূতিয়ার বিলের সৌন্দর্য যেন আরও বাড়ে। পানিতে মেঘের ছায়া, বাতাসে দুলতে থাকা পদ্ম-শাপলা আর নৌকার বৈঠার ছলাৎছল শব্দ—সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক মায়াবী পরিবেশ। শহরের কোলাহল থেকে দূরে কিছুটা সময় প্রকৃতির সান্নিধ্যে কাটাতে পরিবার, বন্ধু ও প্রিয়জনদের নিয়ে এখানে আসছেন অনেকে।
বিলের সৌন্দর্য উপভোগের অন্যতম আকর্ষণ ছোট নৌকায় ভ্রমণ। ফুলে ভরা জলপথের মধ্য দিয়ে নৌকা নিয়ে এগিয়ে যান স্থানীয় মাঝিরা। নৌকায় বসে কেউ পদ্ম-শাপলার সঙ্গে ছবি তুলছেন, কেউ মোবাইল ফোনে ধারণ করছেন ভিডিও। আবার কেউ নীরবে উপভোগ করছেন প্রকৃতির এই অপরূপ আয়োজন। দর্শনার্থীদের আনাগোনায় ব্যস্ততা বেড়েছে স্থানীয় নৌকার মাঝিদেরও।
স্থানীয়রা জানান, পদ্মফুল ফোটার মৌসুমে প্রতিবছরই ভূতিয়ার বিলে দর্শনার্থীর সংখ্যা বাড়ে। কয়েক বছর ধরে স্থানীয় অনেকেই নৌকা দিয়ে পর্যটকদের বিল ঘুরিয়ে দেখাচ্ছেন। এতে তাদের মৌসুমি আয়ের একটি নতুন পথ তৈরি হয়েছে। দর্শনার্থীদের কেন্দ্র করে ভবিষ্যতে ছোট পরিসরে বিভিন্ন সেবার সুযোগও তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
তবে ভূতিয়ার বিলের গল্প শুধু সৌন্দর্যের নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা ও মানুষের জীবন-জীবিকার সংকটও। স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৩ সাল থেকে বিলের প্রায় ২০ হাজার একর জমি স্থায়ী জলাবদ্ধতার মধ্যে রয়েছে। এতে কৃষিকাজ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিলপাড়ের কয়েকটি গ্রামের বহু পরিবার জীবিকার সন্ধানে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়েছে।
এখনও যারা বিলের আশপাশে বসবাস করছেন, তাদের অনেকের জীবিকা নির্ভর করে মাছ ধরা ও জলজ সম্পদের ওপর। ভূতিয়ার বিলে কৈ, শিং, মাগুর, শোল, গজাল, রয়না, খলিশা ও পুঁটিসহ বিভিন্ন দেশীয় মাছ পাওয়া যায়। শীতকালে পানি কমে গেলে জাল ও পোলো নিয়ে বিলে নামেন স্থানীয়রা। মাছ ধরাকে ঘিরে তখন বিলপাড়ে তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ।
তেরখাদা উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, ভূতিয়ার বিলের আয়তন প্রায় সাড়ে ৩ হাজার হেক্টর। এর মধ্যে আনুমানিক ৪০ থেকে ৫০ হেক্টর এলাকায় পদ্মফুল ফুটে। বিলের বড় একটি অংশ আগাছা ও শেওলায় আচ্ছাদিত হয়ে রয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, ভূতিয়ার বিলের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রেখে এটিকে পর্যটনবান্ধব করে গড়ে তোলার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। নিরাপদ নৌযাত্রা নিশ্চিত করা, দর্শনার্থীদের জন্য ঘাট ও বসার ব্যবস্থা, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং পর্যাপ্ত নিরাপত্তার পাশাপাশি পদ্ম-শাপলা ও দেশীয় মাছের আবাস সংরক্ষণ করা গেলে এখানে পর্যটনের পরিধি আরও বাড়তে পারে। এর মাধ্যমে স্থানীয় মানুষের জন্য স্থায়ী ও মৌসুমি কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি হতে পারে।
একদিকে দীর্ঘ জলাবদ্ধতায় মানুষের জীবন-জীবিকায় সংকট, অন্যদিকে বর্ষা এলেই সেই পানির বুকজুড়ে পদ্ম-শাপলার অপরূপ উৎসব—ভূতিয়ার বিলের গল্পে তাই মিশে আছে বেদনা ও সৌন্দর্য। পরিকল্পিত উদ্যোগে এই প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ ও পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তোলা গেলে তেরখাদার ভূতিয়ার বিল খুলনা ও আশপাশের জেলার মানুষের জন্য হয়ে উঠতে পারে সম্ভাবনাময় এক নান্দনিক পর্যটন গন্তব্য।

