রাসেল আহমেদ,খুলনা প্রতিনিধি
খুলনার তেরখাদা উপজেলার বুক চিরে বয়ে যাওয়া চিত্রা নদী একসময় ছিল এলাকার জীবনধারার অবিচ্ছেদ্য অংশ। কৃষি, মাছ ধরা, গৃহস্থালির কাজ—সব কিছুতেই নির্ভরতা ছিল এই নদীর ওপর। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই নদী আজ যেন মৃত্যু পথযাত্রী। প্রতিদিন বাজার ও বসতবাড়ির বর্জ্যে দূষিত হচ্ছে নদীর পানি, নষ্ট হচ্ছে প্রাকৃতিক পরিবেশ, আর এতে মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়েছে জনস্বাস্থ্য।
উপজেলার তিনটি প্রধান বাজার—কাটেংগা, জয়সেনা ও তেরখাদা—নদীর তীর ঘেঁষেই গড়ে উঠেছে। ফলে বাজারের যাবতীয় ময়লা-আবর্জনা, মাছ-মাংসের উচ্ছিষ্ট, পচা সবজি, পশুর রক্ত, মুরগির বিষ্ঠা এমনকি বাসি খাবারও সরাসরি ফেলা হচ্ছে নদীর পানিতে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, এসব বাজারে নেই কোনো নির্ধারিত ডাস্টবিন বা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যবস্থা। পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও ব্যবসায়ীরা বাধ্য হয়েই প্রতিদিন ময়লা ফেলে দিচ্ছেন নদীতে। নদীপাড়জুড়ে জমেছে আবর্জনার স্তূপ, চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছে তীব্র দুর্গন্ধ।
বাজারের ব্যবসায়ীরা জানাচ্ছেন, এমন পরিবেশে ক্রেতারাও দোকানে আসতে চাচ্ছেন না। কাটেংগা বাজারের ব্যবসায়ী বাদশা শেখ বলেন, বাজারে ময়লা ফেলার ব্যবস্থা না থাকায় নিরুপায় হয়ে নদীতেই ফেলা হচ্ছে।
আরেক ব্যবসায়ী রুবেল শেখ জানান, এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না।
শুধু বাজারই নয়, নদীপাড়ের বাসিন্দারাও নিয়মিতভাবে নদীতে বর্জ্য ফেলছেন। অনেকেই সেই দূষিত পানি দিয়েই বাসন-কোসন ধোয়া, কাপড় কাচা, এমনকি গোসলও করছেন। এতে করে হু হু করে বাড়ছে পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব। শিশু ও বৃদ্ধদের মধ্যে ডায়রিয়া, চর্মরোগ, জ্বরসহ নানা সমস্যা দেখা দিচ্ছে।
বাজার বণিক সমিতির সভাপতি মোল্যা হুমায়ুন কবির বলেন, যদি নির্দিষ্টভাবে বর্জ্য ফেলার স্থান বরাদ্দ দেওয়া হতো, তাহলে কেউই নদীতে ময়লা ফেলত না। তার মতে, বাজার পরিচালনায় প্রশাসনের সহযোগিতা না থাকলে এই সমস্যা থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।
তেরখাদা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জান্নাতুল আফরোজ স্বর্ণা জানিয়েছেন, বাজার কমিটিকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য নির্দিষ্ট স্থান চিহ্নিত করার দায়িত্ব দেওয়া হবে। এরপরও কেউ যদি নদীতে বর্জ্য ফেলে, তাহলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
এদিকে, নদীর এই করুণ পরিণতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এলাকার পরিবেশ সচেতন মহল। তাদের মতে, অবিলম্বে কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে না তুললে নদী যেমন ধ্বংস হবে, তেমনি তেরখাদা উপজেলাও পড়বে ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে।
চিত্রা শুধু একটি নদীর নাম নয়, এটি তেরখাদার সংস্কৃতি, ইতিহাস ও অস্তিত্বের অংশ। এই নদীকে বাঁচাতে না পারলে হারিয়ে যাবে এক প্রজন্মের জীবনচিত্র।

