রাসেল আহমেদ,খুলনা প্রতিনিধি
খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার শরাফপুর ইউনিয়নের ভূলবাড়িয়া গ্রামে কৃষিতে যোগ হয়েছে নতুন মাত্রা। ঘেরের পাড়ে মাচা করে এখন বাণিজ্যিকভাবে চাষ হচ্ছে সাম্মাম—মরুভূমির ফল নামে পরিচিত এই বিদেশি ফলটির মিষ্টতা ও ঘ্রাণ এখন গ্রামীণ বাজারে সাড়া ফেলেছে। কৃষকেরাও বলছেন, এই চাষ এনে দিচ্ছে অর্থনৈতিক স্বস্তি।
এই নতুন সম্ভাবনার চাষ শুরু করেন ভূলবাড়িয়ার কৃষক মোঃ মোকাদ্দাস গাজী। তিনি পরীক্ষামূলকভাবে দুই বিঘা জমিতে সাম্মাম আবাদ করেন। তাঁর ব্যয় হয় প্রায় ৫০ হাজার টাকা। ফলন এবং বাজারদর মিলিয়ে তাঁর আয় ছাড়ায় এক লাখ টাকা। সাফল্য দেখে শাহিন উদ্দিন গাজী, গোলাম রসুল শেখসহ আরও অনেক কৃষকও এই চাষে যুক্ত হয়েছেন।
জুন মাসের মাঝামাঝি সময়ে সাম্মামের বীজ রোপণ করা হয় এবং মাত্র ৭০ থেকে ৮০ দিনের মধ্যেই ফল সংগ্রহ করা যায়। অন্যান্য ফলের তুলনায় কম সময়ে বেশি লাভ দেয় সাম্মাম। বিঘা প্রতি খরচ যেখানে ২০-২৫ হাজার টাকার মতো, আয় সেখানে এক লাখ টাকা বা তার বেশি।
সাম্মাম চাষের পাশাপাশি ঘেরের পাড়ে অফসিজন শিম, নিচে শাকসবজি, আর মাচায় তরমুজ, কুমড়া, শসার মতো ফসলও উঠছে। একই জমি থেকে একাধিক ফসল তুলে কৃষকেরা ঘেরকেন্দ্রিক কৃষিকে পরিণত করছেন লাভজনক চাষে।
ডুমুরিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মোঃ ইনসাদ ইবনে আমিন জানিয়েছেন, কৃষকদের কারিগরি পরামর্শ ও চাষ সংক্রান্ত সহায়তা দেওয়া হচ্ছে নিয়মিত। এবারের মৌসুমে সরকারি সহায়তা দেওয়া সম্ভব না হলেও ভবিষ্যতে বীজ সরবরাহ ও প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এই সাফল্য শুধু ভূলবাড়িয়াতে সীমাবদ্ধ নেই। খুলনার বটিয়াঘাটা, দাকোপ, রূপসা ও তেরখাদা উপজেলাতেও সাম্মামের চাষ ছড়িয়ে পড়ছে। খুলনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এ বছর জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ১৭ হেক্টর জমিতে সাম্মাম আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে ৫ হেক্টরের ফসল ইতোমধ্যে ঘরে তোলা হয়েছে। গড়ে হেক্টরপ্রতি ২৪ মেট্রিক টন উৎপাদন ধরে এবার মোট উৎপাদন দাঁড়াতে পারে প্রায় ৪০৮ মেট্রিক টন।
খুলনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মোঃ নজরুল ইসলাম জানিয়েছেন, সাম্মামের চাষ পদ্ধতি সহজ, ফলন ভালো এবং বাজারে চাহিদাও বাড়ছে। প্রশিক্ষণ ও বাজার ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন হলে সাম্মাম হতে পারে একটি লাভজনক কৃষি খাত।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খুলনা অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক কৃষিবিদ মোঃ রফিকুল ইসলাম ভূলবাড়িয়ার চাষাবাদ ঘুরে দেখেছেন। তিনি বলেন, ঘেরের পাড়ের জমি কাজে লাগিয়ে কৃষকেরা যে সফলতা দেখাচ্ছেন, তা শুধু ডুমুরিয়ায় নয়, খুলনার অন্যান্য উপজেলাতেও ছড়িয়ে দেওয়া হবে। এক ইঞ্চি জমিও অনাবাদি না রেখে, চাষযোগ্য করে গড়ে তুলছে এখানকার মানুষ।
বর্তমানে স্থানীয় বাজারে সাম্মামের কেজি প্রতি দাম ১৩০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত। রাজধানীসহ দেশের বড় শহরগুলোতে এর চাহিদা বাড়ছে দ্রুত। পরিবহন ও সংরক্ষণের দিক থেকেও সাম্মাম তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক। তাই বাণিজ্যিকভাবে এই ফলকে কৃষকের আয় বৃদ্ধির একটি কার্যকর উৎস হিসেবে ধরা হচ্ছে।
খুলনার জলবায়ু ও মাটি সাম্মামের জন্য উপযোগী প্রমাণিত হয়েছে। কৃষি কর্মকর্তারা মনে করছেন, সঠিক সহায়তা, উন্নত বীজ এবং প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে সাম্মাম চাষ শুধু দক্ষিণাঞ্চল নয়, দেশের নানা অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতিতেও নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে।

