রাসেল আহমেদ, খুলনা প্রতিনিধি
সুন্দরবনসংলগ্ন খুলনার উপকূলীয় জনপদে তীব্র খাবার পানির সংকটে মানবেতর জীবনযাপন করছেন লাখো মানুষ। জেলার প্রায় ৩০০ গ্রামের বাসিন্দারা বছরের অধিকাংশ সময় বাড়ির আঙিনায় সংরক্ষিত বৃষ্টির পানির ওপর নির্ভর করে জীবনধারণ করছেন। ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত লবণাক্ততার কারণে গভীর নলকূপ স্থাপনের উদ্যোগও অধিকাংশ ক্ষেত্রে ব্যর্থ হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, পাইকগাছা, কয়রা, দাকোপ ও বটিয়াঘাটা উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে নিরাপদ পানির সংকট চলছে। শিবসা, কাজীবাছা, কপোতাক্ষ ও শাকবাড়িয়া নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ায় মিঠাপানির প্রবাহ কমে গেছে। এতে কৃষি ও মৎস্য খাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
পাইকগাছা উপজেলার শামুকপোতা গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল করিম বলেন, “বছরের বেশিরভাগ সময় ট্যাঙ্কে জমা বৃষ্টির পানি খেয়ে থাকি। বর্ষার সময়ও অনেক সময় মিঠা পানি পাওয়া যায় না। তখন দূর থেকে পানি আনতে হয়।”
কয়রা উপজেলার বাগালি ইউনিয়নের গৃহিণী হালিমা বেগম বলেন, “লবণাক্ত পানি দিয়ে রান্না করা যায় না। খাওয়ার পানির জন্য প্রতিদিনই কষ্ট করতে হয়। অনেক সময় কয়েক কিলোমিটার দূর থেকে পানি আনতে হয়।”
জানা গেছে, কয়রা ও পাইকগাছা উপজেলায় ৬৭টি খাল ভরাট হয়ে যাওয়ায় মিঠাপানির স্বাভাবিক উৎসগুলো প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এতে মাছের প্রাকৃতিক বিচরণ ক্ষেত্র সংকুচিত হয়েছে এবং কৃষি উৎপাদন কমে গেছে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় এ সংকট আরও প্রকট হয়ে ওঠে। ঘূর্ণিঝড় আইলা ও আম্ফানের সময় দাকোপ ও কয়রায় পানির তীব্র সংকটে মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়ে। তখন বিভিন্ন সংস্থা ও কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় জরুরি ভিত্তিতে পানি সরবরাহ করতে হয়।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, খুলনার নির্বাহী প্রকৌশলী ইঞ্জিনিয়ার মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, “উপকূলীয় এলাকায় পানিতে লবণাক্ততার মাত্রা অনেক বেশি হওয়ায় গভীর নলকূপ স্থাপন সব জায়গায় সম্ভব হচ্ছে না। তাই বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও পুকুর খননের মতো বিকল্প ব্যবস্থার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।”
অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, পাইকগাছার দেলুটি, কপিলমুনি, রাড়ুলী, লস্কর, শোলাদানা, গড়ইখালি, চাঁদখালি, হরিঢালি, লতা ও গদাইপুর; কয়রার আমাদি, বাগালি, মহেশ্বরীপুর, মহারাজপুর, উত্তর ও দক্ষিণ বেদকাশি; বটিয়াঘাটার সুরখালি ও জলমা; দাকোপের বাজুয়া, তিলডাঙ্গা, পানখালি, সুতারখালি, কামারখোলা, লাউডোব, কৈলাশগঞ্জ ও বানিয়াশান্তা ইউনিয়নে বছরের অন্তত আট মাস তীব্র পানিসংকট থাকে।
এ অঞ্চলের মানুষের জন্য প্রায় ৪০ হাজার পানি সংরক্ষণ ট্যাঙ্ক সরবরাহ করা হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। স্থানীয়দের অভিযোগ, ট্যাঙ্ক বিতরণে অতীতে অনিয়ম ও বৈষম্য ছিল।
দাকোপ উপজেলার বাজুয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা শেখ মফিজুর রহমান বলেন, “অনেকেই ট্যাঙ্ক পেয়েছে, আবার অনেকেই পায়নি। যাদের বেশি প্রয়োজন, তারাই বঞ্চিত হয়েছে।”
সরকারি হিসাবে জানা গেছে, দাকোপ উপজেলার বাজুয়া ইউনিয়নের দুটি গ্রামে ২৬টি এবং দাকোপ ইউনিয়নে মাত্র তিনটি গভীর নলকূপ স্থাপন করা সম্ভব হয়েছে। শিবসা ও পশুর নদীতীরবর্তী আরও সাতটি ইউনিয়নে লবণাক্ততার কারণে গভীর নলকূপ স্থাপন সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে বটিয়াঘাটার জলমা এলাকায় পানির স্তর ২০ থেকে ২৫ ফুট নিচে নেমে গেছে।
স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিনের এ সংকট নিরসনে উপকূলীয় এলাকায় টেকসই ও বড় পরিসরের নিরাপদ পানি সরবরাহ প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন করা জরুরি। তা না হলে প্রতি বছরই পানিসংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করবে।

