নওগাঁ প্রতিনিধি
দুই হাত নেই, তবুও থেমে থাকেনি স্বপ্নের পথচলা। খাতার ওপর ঝুঁকে মুখে কলম ধরে ধীরে ধীরে অক্ষর লিখেই এবারের দাখিল পরীক্ষায় জিপিএ-২.৯৪ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার বালিচাঁদ দারুল উলুম দাখিল মাদ্রাসার শিক্ষার্থী রিয়াদ হোসেন।
রিয়াদ হোসেন উপজেলার বালিচাঁদ গ্রামের মো. আইনাল হোসেনের ছেলে। জন্ম থেকেই তার দুই হাত নেই। তাই অন্যদের মতো হাতে কলম ধরে লেখা সম্ভব নয়। ছোটবেলা থেকেই নানা সীমাবদ্ধতার সঙ্গে লড়াই করে পড়াশোনা চালিয়ে আসছে সে। লেখাপড়ার জন্য মুখে কলম ধরাকেই বানিয়েছে নিজের শক্তি।
রিয়াদের কাছে দাখিল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া শুধু একটি ফলাফল নয়; এটি দীর্ঘদিনের প্রতিবন্ধকতা, কষ্ট ও সংগ্রাম পেরিয়ে অর্জিত একটি সাফল্য। অন্যদের কাছে স্বাভাবিক অনেক কাজই তার জন্য ছিল কঠিন। পড়াশোনার ক্ষেত্রেও তাকে খুঁজে নিতে হয়েছে বিকল্প পথ। মুখে কলম ধরে লেখার অভ্যাস গড়ে তুলে ধীরে ধীরে সে হয়ে ওঠে এতে অভ্যস্ত।
মাদ্রাসার শিক্ষক ও সহপাঠীরা জানান, পড়াশোনার প্রতি রিয়াদের আগ্রহ ছিল প্রবল। মুখে কলম ধরে লিখতে শুরুতে নানা অসুবিধা হলেও হাল ছাড়েনি সে। নিয়মিত পড়াশোনা ও পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে শেষ পর্যন্ত দাখিল পরীক্ষায় সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়েছে।
রিয়াদের এই সাফল্যে সবচেয়ে বেশি আনন্দিত তার পরিবার ও শিক্ষকরা। শারীরিক সীমাবদ্ধতা তাকে কখনো পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবতে দেয়নি। বরং প্রতিটি বাধাকে জয় করে নিজের স্বপ্নের দিকে এগিয়ে গেছে সে।
ভবিষ্যতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে একজন আদর্শ শিক্ষক হতে চায় রিয়াদ। নিজের মতো শারীরিক প্রতিবন্ধী ও সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের পড়াশোনায় উৎসাহিত করারও স্বপ্ন রয়েছে তার।
বালিচাঁদ দারুল উলুম দাখিল মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত সুপার নুরুল ইসলাম বলেন, “রিয়াদ শারীরিক প্রতিবন্ধী হওয়া সত্ত্বেও লেখাপড়ায় অত্যন্ত মনোযোগী ছিল। মুখে কলম ধরে লিখে এবারের দাখিল পরীক্ষায় সে উত্তীর্ণ হয়েছে। ভবিষ্যতে সে যেন তার স্বপ্ন পূরণ করতে পারে, আমরা তার সর্বাঙ্গীণ মঙ্গল কামনা করি।”
নিয়ামতপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শফিউল আলম বলেন, “রিয়াদ হোসেন শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে মুখে লিখে দাখিল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। তার এই সাফল্য সত্যিই প্রশংসনীয়। ভবিষ্যতে সে একজন আদর্শ শিক্ষক হয়ে সমাজে অবদান রাখবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোছা. মুর্শিদা খাতুন বলেন, “রিয়াদের এই সাফল্য অত্যন্ত প্রশংসনীয়। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। ভবিষ্যতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে সে সমাজে অবদান রাখবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।”
রিয়াদের সাফল্য প্রমাণ করে, শারীরিক সীমাবদ্ধতা মানুষের স্বপ্নপূরণের পথে শেষ কথা নয়। অদম্য ইচ্ছাশক্তি, পরিশ্রম ও আত্মবিশ্বাস থাকলে প্রতিকূলতাকেও জয় করে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।

