মধুখালী (ফরিদপুর) প্রতিনিধি
ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার কামারখালী ইউনিয়নে অবস্থিত শত বছরের পুরোনো কামারখালী বাজারে এখনও গড়ে ওঠেনি পর্যাপ্ত গণশৌচাগার। ময়লা-আবর্জনা ফেলার জন্য নেই নির্ধারিত স্থান। এমনকি পানি নিষ্কাশনের জন্যও নেই পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা। ফলে বাজারে আসা ক্রেতা-বিক্রেতাদের প্রতিনিয়ত চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। সামান্য বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতায় ভোগান্তি আরও বেড়ে যায়।
এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বাজারের একাধিক ব্যবসায়ী। তাদের অভিযোগ, শুধু কামারখালী নয়, মধুখালী উপজেলার অধিকাংশ বাজারেই রয়েছে এমন অব্যবস্থাপনা। তারা দ্রুত বাজারে স্বাস্থ্যসম্মত গণশৌচাগার, ময়লা-আবর্জনা ফেলার নির্ধারিত স্থান এবং পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
জানা গেছে, মধুখালী উপজেলায় একটি পৌরসভা ও ১১টি ইউনিয়নে দৈনিক ও সাপ্তাহিক হাট মিলিয়ে অন্তত এক ডজন বাজার রয়েছে। এসব বাজারে প্রতিদিনই বিপুলসংখ্যক ক্রেতা-বিক্রেতার সমাগম ঘটে। কিন্তু অধিকাংশ বাজারেই নেই ময়লা-আবর্জনা ফেলার নির্দিষ্ট স্থান, কার্যকর ড্রেনেজ ও গণশৌচাগার ব্যবস্থা। এতে বাজারে আসা মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে।
কামারখালী বাজারটি ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের পাশে পুরোনো ফেরিঘাট পর্যন্ত প্রায় এক বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে গড়ে উঠেছে। এখানে প্রতিদিন বাজার বসার পাশাপাশি প্রতি শুক্র ও সোমবার নিয়মিত হাট বসে। কাঁচাবাজারের পাশাপাশি ফরিদপুরের বিভিন্ন উপজেলা এবং পাশের জেলার ব্যবসায়ীরাও ধান, পাট, চৈতালি ফসলসহ বিভিন্ন পণ্য নিয়ে এ হাটে আসেন।
বিশেষ করে হাটবারে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতাদের ভিড় থাকে। অনেক ব্যবসায়ীকে দীর্ঘ সময় সেখানে অবস্থান করতে হলেও পর্যাপ্ত গণশৌচাগার না থাকায় তাদের বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে অনেক সময় দোকান বন্ধ করে বাড়িতে ফিরে যেতে হয় তাদের।
বাজারে কেনাকাটা করতে আসা লিপি পারভীন বলেন, “প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়া লাগবেই। শিশু-বাচ্চা নিয়ে উপায়ন্তর না পেয়ে নিকটবর্তী একটি বাড়িতে গিয়ে রক্ষা পেয়েছি। বহু বছরের পুরোনো বাজার এভাবে চলতে পারে না।”
স্থানীয় বণিক সমিতির অর্থ সম্পাদক রোকনুজ্জামান বলেন, “সাধারণ ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে বণিক সমিতির নেতাদের এসব বিষয়ে বারবার জানানো হলেও কেন সমাধানে এগিয়ে আসা হয়নি, তা আমাদের জানা নেই। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানকেও একাধিকবার জানানো হয়েছে।”
কামারখালী বাজার বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আব্দুস সালাম মন্ডল বলেন, “পুরোনো এই বাজারটি এখনও রেজিস্ট্রেশন পায়নি। আমরা এ বিষয়ে কাজ করছি। গণশৌচাগার, পয়োনিষ্কাশন ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা খুবই জরুরি। তবে কিছু জটিলতা রয়েছে।”
বাজার বণিক সমিতির সভাপতি কাজী মতিউল ইসলাম মুরাদ বলেন, “স্বাস্থ্যসম্মত ও আধুনিক একটি টয়লেট আছে। কিন্তু সুইপার না থাকায় সেটি সবার জন্য উন্মুক্ত করা যাচ্ছে না। বাজারে কোনো ঝাড়ুদার না থাকায় নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখাও সম্ভব হচ্ছে না। ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নত করা যাচ্ছে না, কারণ রেলের কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া কঠিন।”
কামারখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. রাকিব হোসেন চৌধুরী ইরান বলেন, “নারী ও পুরুষের জন্য পৃথক টয়লেট নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু সুইপার না থাকায় সবার জন্য উন্মুক্ত করা যাচ্ছে না। বাজারের ভেতর দিয়ে রেলপথ যাওয়ায় এবং মধুমতি নদীর ওপর রেলসেতু নির্মাণাধীন থাকায় বিভিন্ন মালামাল পরিবহন করতে হয়। বাজারে ড্রেন রয়েছে, তবে মাটিতে ভরে যায়। কয়েকবার পরিষ্কার করা হয়েছে, কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই আবার ভরে যায়।”
এ বিষয়ে মধুখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাসুদুর রহমান বলেন, “কামারখালী বাজার ব্যবস্থাপনার বিষয়ে সেখানকার বণিক সমিতি ও সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যানের সঙ্গে যোগাযোগ করে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। পাশাপাশি উপজেলার অন্যান্য বাজারগুলোর বিষয়েও খোঁজখবর নেওয়া হবে।”
উল্লেখ্য, একসময় বড় বড় নৌযান কামারখালী ঘাটে ভিড়ত। পাটের বড় বাজার হিসেবে এখানে অনেক বড় জুট মিলের ক্রয়কেন্দ্রও ছিল। সময়ের পরিক্রমায় সেই ব্যস্ততার অনেকটাই এখন স্মৃতি। মধুমতি নদীর তীরে অবস্থিত হওয়ায় একসময় নৌপথে পণ্য ও মানুষের চলাচল ছিল সহজ ও সাশ্রয়ী। বর্তমানে বাজারটির ঐতিহ্য থাকলেও প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধার ঘাটতি নিয়ে ভোগান্তিতে পড়ছেন ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ।

