বকশীগঞ্জ (জামালপুর) প্রতিনিধি
জামালপুরের বকশীগঞ্জে দেলোয়ার হোসেন নামে এক বীর মুক্তিযোদ্ধার গার্ড অব অনার প্রদানে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার বিরুদ্ধে। তাঁকে ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা’ দাবি করে বাধা দেওয়ায় শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ছাড়াই তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়েছে।
এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
জানা গেছে, বুধবার দিবাগত রাতে ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান বীর মুক্তিযোদ্ধা দেলোয়ার হোসেন। বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) বিকেল ৫টায় বকশীগঞ্জ উপজেলার সাধুরপাড়া ইউনিয়নের মদনেরচর গ্রামে তাঁর জানাজার সময় নির্ধারণ করা হয়।
জানাজার আগে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার প্রদানের জন্য উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহকারী কমিশনার (ভূমি) আসমা উল হুসনাকে পাঠানো হয়। তবে ঘটনাস্থলে যাওয়ার পথে উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার নওশেদ আলীর নেতৃত্বে কয়েকজন ব্যক্তি প্রশাসনের গাড়ি আটকে দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাঁরা দেলোয়ার হোসেনকে ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা’ দাবি করে গার্ড অব অনার প্রদান না করার জন্য বাধা দেন এবং বিভিন্ন স্লোগান দেন।
একপর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার আশঙ্কায় প্রশাসনের কর্মকর্তারা গার্ড অব অনার না দিয়েই ফিরে আসেন। পরে স্থানীয়ভাবে জানাজা শেষে দেলোয়ার হোসেনকে দাফন করা হয়।
উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্র জানায়, দেলোয়ার হোসেনের নামে সরকারি মুক্তিযোদ্ধা গেজেট রয়েছে। তিনি মুক্তিযোদ্ধা ভাতাসহ সরকারি বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধাও পেয়ে আসছিলেন।
দেলোয়ার হোসেনের ছেলে মো. মমিনুর রহমান স্বপন বলেন, “আমার বাবা সরকারি গেজেটভুক্ত বৈধ মুক্তিযোদ্ধা। তাঁকে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা দাবি করে এর আগে একটি পক্ষ হাইকোর্টে রিট করেছিল। পরে হাইকোর্টের রায়ে তিনি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বহাল থাকেন। আমার বাবা নিয়মিত সরকারি সুযোগ-সুবিধা পেয়ে আসছিলেন। পূর্বশত্রুতার জের ধরে মুক্তিযোদ্ধা নওশেদ আলী এসব করেছেন।”
অভিযোগের বিষয়ে নওশেদ আলী বলেন, “সে একজন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা তাকে কোনো যুদ্ধ বা সহযোগিতা করতে দেখিনি। তাই আমরা তাকে প্রশাসনের গার্ড অব অনার প্রদানে বাধা দিয়েছি।”
সরকারি গেজেটের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “পরবর্তীতে হাইকোর্ট থেকে তাঁর পক্ষে গেজেট পাস হয়েছে—এ বিষয়টি উপজেলা বা জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডে জানানো হয়নি।”
নওশেদ আলী আরও বলেন, “এই উপজেলায় এ ধরনের আরও প্রায় ১০ জন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা রয়েছেন। আমরা তাঁদের কাউকেই রাষ্ট্রীয় কোনো সুবিধা ভোগ করতে দেব না।”
বকশীগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আসমা উল হুসনা বলেন, “মুক্তিযোদ্ধা দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর তাঁর জানাজায় যাওয়ার সময় কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা গার্ড অব অনার প্রদানে বাধা দিয়েছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে গার্ড অব অনার প্রদানের চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু একটি পক্ষ বাধা দেওয়ায় তা সম্ভব হয়নি।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুরাদ হোসেন বলেন, “মৃত দেলোয়ার হোসেন মাস্টারের নামে সরকারি মুক্তিযোদ্ধা গেজেট রয়েছে। সেই ভিত্তিতেই তাঁর জানাজায় উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে গার্ড অব অনার প্রদানের জন্য সহকারী কমিশনার (ভূমি)কে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের একটি পক্ষ রাস্তায় প্রশাসনের গাড়ি আটকে বাধা দেয়। শেষ পর্যন্ত তারা প্রশাসনকে গার্ড অব অনার প্রদান করতে দেয়নি।”
এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনা-সমালোচনা সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, দেলোয়ার হোসেনকে তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে জেনে আসছেন এবং তাঁর নামে সরকারি গেজেটও রয়েছে। ফলে তাঁর জানাজার আগে প্রশাসনের গার্ড অব অনার প্রদানে বাধা দেওয়ার ঘটনায় তাঁরা বিস্মিত। বিষয়টি যথাযথভাবে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

