রুহুল আমিন, যশোর প্রতিনিধি
পট, শেওলা ও কচুরিপানায় ঢেকে গেছে যশোরের ভৈরব নদ। কোথাও পানির ওপর সবুজ আস্তরণ, কোথাও কচুরিপানার স্তূপ। সঙ্গে জমছে ময়লা-আবর্জনা। এতে নদের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে পানি দূষিত হচ্ছে। দীর্ঘদিনের এমন পরিস্থিতিতে নদটির পানি গোসল, গৃহস্থালির কাজ ও কৃষিকাজে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
সরেজমিনে দেখা গেছে, যশোর শহরের দড়াটানা থেকে পুরাতন খয়েরতলা, নূরপুর, পুলতাডাঙ্গা, আব্দুলপুর, বড় হৈবতপুর হয়ে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলা পৌরসভা পর্যন্ত নদের বিভিন্ন অংশে পট, শেওলা ও কচুরিপানার আধিক্য। একই অবস্থা দড়াটানা থেকে নীলগঞ্জ সেতু, রাজারহাট, রূপদিয়া ও বসুন্দিয়া অংশেও। কচুরিপানা ও শেওলার সঙ্গে ময়লা-আবর্জনা আটকে থাকায় কোথাও কোথাও পানির প্রবাহ প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
একসময় ভৈরব ছিল এ অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। নদে জাহাজ চলাচল করত, ছিল জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক প্রবাহ। দীর্ঘদিন দখল ও পলি জমে নদটি নাব্যতা হারালে সরকারের টেকসই উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় কয়েক বছর আগে পুনঃখনন করা হয়। তবে পুনঃখননের পরও নদটি আগের রূপ ফিরে পায়নি বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। এর মধ্যেই বিভিন্ন অংশে বেড়েছে পট, শেওলা ও কচুরিপানার বিস্তার।
বড় হৈবতপুর গ্রামের বাসিন্দা শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘নদের পাড়ে আমার ১০ বিঘা জমি রয়েছে। দীর্ঘদিন ভৈরবের পানি দিয়ে ফসলের সেচ দিয়েছি। কিন্তু প্রায় এক বছর ধরে পট, শেওলা ও কচুরিপানায় পানি আটকে ময়লা ও দূষিত হয়ে গেছে। এখন আর নদের পানি সেচে ব্যবহার করতে পারি না।’
আব্দুলপুর গ্রামের রবিউল ইসলাম বলেন, ‘শেওলা ও কচুরিপানার কারণে নদে ময়লা জমে থাকছে। পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নেই। দ্রুত শেওলা, কচুরিপানা ও ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করা দরকার। চর্মরোগের ভয়ে এখন কেউ নদে নামতে চান না।’
একই গ্রামের মামুন হোসেন বলেন, ‘আগে মাঝে মাঝে নদে মাছ ধরতে নামতাম। কয়েক মাস ধরে চর্মরোগে আক্রান্ত হওয়ায় এখন আর পানিতে নামি না।’
জমেলা বেগম বলেন, ‘একসময় ভৈরবের পানি পরিষ্কার ছিল। নদে গোসল, কাপড় পরিষ্কারসহ রান্নাবান্নার কাজেও পানি ব্যবহার করতাম। প্রায় এক বছর ধরে পট, শেওলা ও কচুরিপানা পরিষ্কার না করায় ময়লা জমে পানি নষ্ট হয়ে গেছে।’
বসুন্দিয়া এলাকার দীন আলী শেখ বলেন, ‘আগে নদীর পানি দিয়ে পশু গোসল করানো, পরিবারের গোসল ও কৃষিকাজে সেচ দেওয়া হতো। এখন কচুরিপানা, শেওলা ও ময়লা-আবর্জনায় পানি কালো ও নোংরা হয়ে গেছে।’
যশোরের ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. নাজমুল সাদিক রাসেল বলেন, ‘চর্মরোগীর সংখ্যা বেড়েছে। বিশেষ করে ভৈরব নদের পাড়ের বাসিন্দাদের মধ্যে এ রোগের হার বেশি। দূষিত পানিতে গোসলের কারণে তারা বিভিন্ন ধরনের চর্মরোগে আক্রান্ত হয়েছেন।’
তবে ভৈরব নদে পট, শেওলা ও কচুরিপানা বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা। যশোর অঞ্চলের পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জী বলেন, ‘ভৈরবের পানি মিষ্টি। সে কারণে অতিরিক্ত পট, শেওলা ও কচুরিপানা জন্মায়। লবণ পানিতে এগুলো জন্মায় না। ভৈরব নদে লবণ ছিটিয়ে দিলে এগুলোর জন্ম বন্ধ হবে। তবে পরিবেশের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে নদে লবণ মেশানো সম্ভব নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘পট, শেওলা ও কচুরিপানা পরিষ্কারের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে কোনো বাজেট দেওয়া হচ্ছে না। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে। পরিষ্কারের জন্য বরাদ্দ পাওয়া গেলে দ্রুত কাজ শুরু করা সম্ভব হবে।’
যশোরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কমলেশ মজুমদার বলেন, ‘ভৈরব নদে পট, শেওলা ও কচুরিপানা ভরে গেছে। এটি পরিষ্কারের বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

