রাসেল আহমেদ,খুলনা প্রতিনিধি
খুলনার পাইকগাছা উপজেলার খড়িয়া নবারুন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দীপক চন্দ্র সরকারকে ঘিরে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। ভারতীয় ভোটার তালিকায় তার নাম থাকার অভিযোগ, বিদ্যালয়ের আর্থিক অনিয়ম, নিয়োগ বাণিজ্য ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা থাকলেও তিনি এখনো স্বপদে বহাল রয়েছেন। এতে স্থানীয় বাসিন্দা, অভিভাবক ও সচেতন মহলে ক্ষোভ বিরাজ করছে।
স্থানীয় সূত্র ও প্রশাসনিক নথিপত্রের বরাত দিয়ে জানা যায়, পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব বর্ধমান জেলার শক্তিগড় থানার বরশুল এলাকার ভোটার তালিকায় দীপক চন্দ্র সরকারের নাম রয়েছে। একই সময়ে তিনি খুলনার পাইকগাছা উপজেলার লস্কর ইউনিয়নের খড়িয়া ঢেমশাখালী গ্রামের ভোটার হিসেবেও তালিকাভুক্ত রয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এছাড়া তার স্ত্রী অপর্ণা সরকার, মেয়ে জয়শ্রী সরকার, বড় ভাই দুলাল চন্দ্র সরকার ও ছোট ভাই তাপস সরকারের নামও ভারতের ভোটার তালিকায় রয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি।
স্থানীয় বাসিন্দা প্রকাশ চন্দ্র সরকার বলেন, “প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। তিনি ভারতের নাগরিক হয়েও এখানে চাকরি করছেন বলে আমরা জানতে পেরেছি। নিয়োগের নামে লাখ লাখ টাকা আদায় এবং বিদ্যালয়ের বিভিন্ন খাতে বরাদ্দ অর্থে অনিয়মের অভিযোগ বহুবার উঠলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।”
অভিযোগ রয়েছে, বিদ্যালয়টিকে ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তারের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অনিয়ম চালিয়ে আসছেন তিনি। বিশেষ করে ২০২৪ সালে পরিচ্ছন্নতা কর্মী, নিরাপত্তা কর্মী ও আয়া নিয়োগকে কেন্দ্র করে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয়। অভিযোগ ওঠে, আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় মানববন্ধন, বিক্ষোভ, মিছিল এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে স্মারকলিপিও দেওয়া হয়।
শুধু নিয়োগ নয়, বিদ্যালয়ের আর্থিক ব্যবস্থাপনাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরের সরকারি প্রণোদনা অনুদানের অর্থ ব্যয়ে অনিয়ম এবং কেনাকাটা ও সংস্কার কাজের বিল-ভাউচারে অসঙ্গতির তথ্য তদন্তে উঠে এসেছে।
অভিযোগের বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে একাধিক তদন্ত করা হয়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নির্দেশে উপজেলা রিসোর্স অফিসার মো. ঈমান উদ্দিন ২০২৪ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। পরে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শাহজাহান আলীর নেতৃত্বে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি ২০২৫ সালের ৩০ জানুয়ারি পৃথক প্রতিবেদন জমা দেয়। একই বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর জেলা শিক্ষা বিভাগের পক্ষ থেকেও পুনরায় তদন্ত করা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চলতি বছরের ১ ফেব্রুয়ারি জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো এক প্রতিবেদনে ইউএনও ওয়াসিউজ্জামান চৌধুরী উল্লেখ করেন, ভোটার তালিকার তথ্য অনুযায়ী প্রধান শিক্ষক দীপক চন্দ্র সরকারের ভারতীয় নাগরিকত্বের বিষয়টি সামনে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, এমপিও নীতিমালা অনুযায়ী শিক্ষক বা কর্মচারীকে বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে। সে ক্ষেত্রে বিদেশি নাগরিকের এমপিওভুক্ত পদে কর্মরত থাকা আইনগত ও প্রশাসনিকভাবে প্রশ্নের জন্ম দেয়।
পরে খুলনার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) কানিজ ফাতেমা লিজা বিষয়টিকে ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর’ উল্লেখ করে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালকের কাছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানান। তবে প্রতিবেদন পাঠানোর পরও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন প্রধান শিক্ষক দীপক চন্দ্র সরকার। তিনি বলেন, “আমি ভারতের ভোটার নই, আমি বাংলাদেশের নাগরিক। আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। নিয়োগ বাণিজ্য কিংবা অনুদানের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগেরও কোনো ভিত্তি নেই।”
এ বিষয়ে স্থানীয়দের দাবি, একাধিক তদন্ত ও প্রশাসনিক প্রতিবেদনে বিভিন্ন তথ্য উঠে আসার পরও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। তারা দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

