যশোর প্রতিনিধি
কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে ড্রেন নির্মাণ এবং প্রতিবছর ড্রেন পরিষ্কার ও রক্ষণাবেক্ষণে প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয় করেও বর্ষা এলেই জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পাচ্ছে না যশোর পৌরসভার বাসিন্দারা। সামান্য ভারী বৃষ্টিতেই শহরের সড়ক, বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আবাসিক এলাকায় পানি জমে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে রয়েছেন ৫, ৭ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দারা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, উন্নয়ন প্রকল্পে বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও পরিকল্পনার ঘাটতি, ড্রেনের অপর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণ, খাল-ড্রেন সংযোগের দুর্বলতা এবং ড্রেনে নির্বিচারে বর্জ্য ফেলার কারণে প্রতিবছর একই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঘটছে।
পৌরসভার তথ্য অনুযায়ী, যশোর পৌরসভার ৯টি ওয়ার্ডে মোট ২৫১ দশমিক ৯৬ কিলোমিটার ড্রেন রয়েছে। এর মধ্যে ৪৯ দশমিক ২২ কিলোমিটার আরসিসি, ৬৯ দশমিক ২৫ কিলোমিটার ইটের গাঁথুনির, ৫ কিলোমিটার পাইপ ড্রেন এবং ১২৮ দশমিক ৪৯ কিলোমিটার কাঁচা ড্রেন। অর্থাৎ, মোট ড্রেনের অর্ধেকেরও বেশি এখনও কাঁচা, যা বর্ষাকালে দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
চলতি অর্থবছরে ড্রেন পরিষ্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দুই কোটি ২৬ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ইতোমধ্যে প্রায় এক কোটি ৮৮ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে, যা মোট বরাদ্দের প্রায় ৮৩ শতাংশ। হিসাব অনুযায়ী, প্রতি কিলোমিটার ড্রেন পরিষ্কারে বছরে গড়ে প্রায় ৭৫ হাজার টাকা ব্যয় হচ্ছে।
অন্যদিকে, ৫, ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডে প্রায় ৭ কিলোমিটার নতুন আরসিসি ড্রেন নির্মাণকাজ চলছে। ২০ কোটি ৩৬ লাখ টাকার এই প্রকল্পে প্রতি কিলোমিটার ড্রেন নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ২ কোটি ৯১ লাখ টাকা। পৌর কর্তৃপক্ষের দাবি, প্রকল্পটি শেষ হলে এসব এলাকার জলাবদ্ধতা অনেকাংশে কমে আসবে।
পৌরসভার প্রশাসনিক ও তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তা উত্তম কুমার কুণ্ডু জানান, বর্ষা মৌসুমের আগে নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত প্রতিদিন ১৫০ থেকে ১৬০ জন শ্রমিক ড্রেন পরিষ্কারের কাজে নিয়োজিত থাকেন। প্রয়োজনে এ সংখ্যা ২০০ জন পর্যন্ত বাড়ানো হয়। বর্তমানে প্রতিদিন ৮০ থেকে ৯০ জন শ্রমিক কাজ করছেন এবং প্রত্যেকের দৈনিক মজুরি ৫০০ টাকা।
তিনি জানান, রোববার ৮২ জন শ্রমিকের মজুরি বাবদ ব্যয় হয়েছে ৪১ হাজার টাকা। সোমবারও একই সংখ্যক শ্রমিক কাজ করেছেন এবং আরও ৪১ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। দুই দিনে শুধু শ্রমিকদের হাজিরা বাবদ ব্যয় হয়েছে ৮২ হাজার টাকা। এ হিসাবে বছরে প্রায় ১ কোটি ৪৭ লাখ ৬০ হাজার টাকা শুধু শ্রমিকদের মজুরিতেই ব্যয় হতে পারে। এর বাইরে বর্জ্য অপসারণ, পরিবহন, যন্ত্রপাতি, জ্বালানি ও তদারকির ব্যয়ও রয়েছে।
সরেজমিনে খড়কি, চাঁচড়া, বেজপাড়া, আরবপুর, শংকরপুর, রেলগেট, পালবাড়ি ও বকচর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, অনেক ড্রেন প্লাস্টিক, পলিথিন, কাদা, আগাছা ও পচা বর্জ্যে ভরাট হয়ে আছে। কোথাও কোথাও ড্রেনের তলদেশ পলিতে ভরাট হয়ে পানির প্রবাহ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।
খড়কি এলাকার বাসিন্দা রাকিব হাসান বলেন, “প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের কথা শুনি। কিন্তু ভারী বৃষ্টি হলেই রাস্তা ডুবে যায়। তাহলে উন্নয়নের সুফল কোথায়?”
বেজপাড়া এলাকার ব্যবসায়ী মফিজুল ইসলাম বলেন, “ড্রেন নিয়মিত পরিষ্কার না থাকলে নতুন ড্রেনও দ্রুত ভরাট হয়ে যায়। জলাবদ্ধতার কারণে ক্রেতা কমে যায়, ব্যবসায় লোকসান হয়।”
নাগরিক অধিকার আন্দোলন যশোরের সমন্বয়কারী মাসুদুজ্জামান মিঠু বলেন, “শুধু ড্রেন নির্মাণ করলেই হবে না। পানি প্রবাহের সমন্বিত পরিকল্পনা, খাল পুনরুদ্ধার এবং একটি কার্যকর ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান ছাড়া স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।”
যশোর পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী মো. মখলেছুর রহমান বলেন, পুরনো ও সরু ড্রেনের কারণে কিছু এলাকায় সমস্যা হচ্ছে। নতুন আরসিসি ড্রেন নির্মাণ শেষ হলে বিশেষ করে ৫, ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নতি হবে।
পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জায়েদ হোসেন বলেন, ড্রেন পরিষ্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ নিয়মিত চলছে। চলমান প্রকল্প শেষ হলে এর সুফল পাওয়া যাবে। তবে স্থায়ী সমাধানে নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে।
পৌর প্রশাসক ও স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক মো. রফিকুল হাসান বলেন, জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে পর্যায়ক্রমে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি শহরবাসীকে ড্রেনে প্লাস্টিক, পলিথিন ও গৃহস্থালির বর্জ্য না ফেলার আহ্বান জানিয়ে বলেন, অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি নাগরিক সচেতনতাও জলাবদ্ধতা নিরসনের অন্যতম প্রধান শর্ত।

