স্টাফ রিপোর্টার, নড়াইল
নড়াইলে গত এক দশকে জেলার বিভিন্ন এলাকায় শতাধিক শতবর্ষী গাছ কেটে ফেলা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পরিবেশবাদী, স্থানীয় বাসিন্দা ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রাচীন এসব গাছ নিধনের ফলে পরিবেশের ভারসাম্য, জীববৈচিত্র্য ও জেলার ঐতিহ্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। দ্রুত তালিকা প্রণয়ন করে অবশিষ্ট শতবর্ষী গাছ সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছেন তারা।
নড়াইল সদর উপজেলার মহিষখোলা গ্রামে এখনো দাঁড়িয়ে আছে প্রায় দুই শতাব্দী পুরোনো একটি বিশাল তেঁতুল গাছ। স্থানীয়দের কাছে এটি শুধু একটি গাছ নয়, বরং কয়েক প্রজন্মের স্মৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের জীবন্ত সাক্ষী। প্রবীণ ব্যবসায়ী খগাদা বলেন, গাছটির জন্ম ব্রিটিশ শাসনামলের আগে কিংবা নড়াইলের জমিদারি আমলে। সময়ের পরিবর্তনে আশপাশের বনভূমি ও পুরোনো গাছপালা হারিয়ে গেলেও এই তেঁতুল গাছটি এখনো একই স্থানে দাঁড়িয়ে মানুষকে ছায়া ও ফল দিয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয় বৃক্ষপ্রেমী মনির হাসান বলেন, শতবর্ষী বৃক্ষ একেকটি জীবন্ত ইতিহাস। বহু শিল্পী, কবি ও গীতিকার এসব গাছের ছায়াতলে বসে সৃষ্টিশীল কাজ করেছেন। একটি শতবর্ষী গাছ কেটে ফেললে তার পরিবেশগত ক্ষতি নতুন চারা রোপণ করে অল্প সময়ে পূরণ করা সম্ভব নয়।
নড়াইল সরকারি ভিক্টোরিয়া কলেজের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান কেয়া রেনু রায় বলেন, একটি শতবর্ষী গাছ তৈরি হতে শত বছর সময় লাগে, কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেটি ধ্বংস করা যায়। এসব গাছ অক্সিজেন সরবরাহের পাশাপাশি জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এছাড়া অসংখ্য পাখি, প্রাণী ও কীটপতঙ্গের নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবেও কাজ করে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) নড়াইলের সভাপতি শাহ আলম বলেন, গত দশ বছরে জেলার বিভিন্ন প্রান্তে অসংখ্য শতবর্ষী গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। অবশিষ্ট গাছগুলো দ্রুত তালিকাভুক্ত করে আইনগতভাবে সংরক্ষণ করা জরুরি।
নড়াইল বন বিভাগের সামাজিক বনায়ন নার্সারি ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত ফরেস্ট রেঞ্জার কাজী ইশতিয়াক রহমান জানান, বর্তমানে জেলার শতবর্ষী গাছের কোনো পূর্ণাঙ্গ তালিকা বন বিভাগের কাছে নেই। তবে দ্রুত তালিকা প্রস্তুত করে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে নড়াইলের জেলা প্রশাসক ডা. মোহাম্মদ আব্দুল ছালাম বলেন, জেলার শতবর্ষী গাছগুলো সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রাথমিকভাবে নড়াইল সদর, কালিয়া ও লোহাগড়া উপজেলার তিনটি প্রাচীন গাছের চারপাশে ইটের বেষ্টনী নির্মাণ করে পথচারী ও স্থানীয়দের বিশ্রামের ব্যবস্থা করা হবে।
পরিবেশবাদীদের মতে, উন্নয়নের নামে নির্বিচারে শতবর্ষী গাছ কাটা বন্ধ করে এসব প্রাকৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে প্রশাসন, বন বিভাগ ও স্থানীয় জনগণের সমন্বিত উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।

