আগৈলঝাড়া (বরিশাল) প্রতিনিধি
ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে বরিশালের আগৈলঝাড়ায় মনসামঙ্গল কাব্যের রচয়িতা কবি বিজয় গুপ্ত প্রতিষ্ঠিত ৫৩৩ বছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী গৈলা মনসা দেবীর মন্দিরে বার্ষিক পূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। মঙ্গলবার সকাল থেকে দিনব্যাপী এ আয়োজনে হাজার হাজার নারী-পুরুষ ও শিশু ভক্তের সমাগম ঘটে।
মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে পূজার্চনা শুরু হয়ে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে। মনস্কামনা পূরণ ও পুণ্য লাভের আশায় দূর-দূরান্ত থেকে আসা ভক্তরা মানত পূজা দেন। এ সময় দুধ, কলা, ফল, মিষ্টি, ধূপ-ধুনোসহ বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে পূজা এবং যজ্ঞের আয়োজন করা হয়। কোথাও কোথাও ছাগ বলিদানও দেওয়া হয়। পরে আগত ভক্তদের মধ্যে মহাপ্রসাদ বিতরণ করা হয়।
জগদ্বিখ্যাত কবি বিজয় গুপ্তের স্মৃতি রক্ষায় মনসা মন্দির সংরক্ষণ ও উন্নয়ন কমিটির সভাপতি ড. বিনয় ভূষণ রায় জানান, দেবী মনসার পূজা উপলক্ষে পূজার আগের দিন থেকেই দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ভক্তরা মন্দির প্রাঙ্গণে আসতে শুরু করেন।
তিনি জানান, পূজার আগে মন্দির প্রাঙ্গণে তিন দিনব্যাপী ‘রয়ানী গান’ অনুষ্ঠিত হয়। রয়ানী গানের মাধ্যমে ছন্দ ও সুরের মূর্ছনায় দেবী মনসার পৃথিবীতে চাঁদ সওদাগরের হাতে পূজা পাওয়ার কাহিনি তুলে ধরা হয়।
পূজা সুষ্ঠু ও নির্বিঘ্ন করতে মন্দির কমিটি ও থানা পুলিশের পক্ষ থেকে নেওয়া হয় বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা। মন্দির প্রাঙ্গণ ও আশপাশের এলাকায় শত শত দোকানি বিভিন্ন পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেন। এতে পুরো এলাকা উৎসবমুখর হয়ে ওঠে এবং মন্দির প্রাঙ্গণ রূপ নেয় মেলায়। ভক্ত ও দর্শনার্থীরা পূজার উপকরণের পাশাপাশি ঘর-গৃহস্থালির বিভিন্ন সামগ্রীও কেনাকাটা করেন।
মনসা পূজা উপলক্ষে বরিশাল-১ আসনের সংসদ সদস্য ও তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন সবাইকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন।
পূজা উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নিরুপম মজুমদার, আগৈলঝাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মাসুদ খান, ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের হিন্দু কল্যাণ ট্রাস্টের ট্রাস্টি ও বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান কল্যাণ ফ্রন্টের নির্বাহী কমিটির মহাসচিব সঞ্জয় গুপ্ত, উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব মোল্লা বশির আহমেদ পান্না, সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবুল হোসেন লাল্টু, মনসা মন্দির সংরক্ষণ ও উন্নয়ন কমিটির সভাপতি ড. বিনয় ভূষণ রায়, সাধারণ সম্পাদক ডা. দিলীপ কুমার দাস, মন্দির কমিটির সাবেক সভাপতি তারক চন্দ্র দে, আগৈলঝাড়া প্রেসক্লাবের সভাপতি মো. শামীমুল ইসলাম শামীম, উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক শাহ মো. বখতিয়ার, আবুল মোল্লা, উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক হেমায়েত তালুকদারসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃবৃন্দ।
মন্দির কমিটির সাধারণ সম্পাদক ডা. দিলীপ কুমার দাস জানান, প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী ৫৩৩ বছর আগে, মধ্যযুগে সুলতান হোসেন শাহের শাসনামলে ১৪৯৪ সালে কবি বিজয় গুপ্ত দেবী মনসার স্বপ্নাদেশ পান। এরপর নিজ বাড়ির বিশাল দীঘি থেকে পূজার ঘট তুলে গৈলা গ্রামে নিজ বাড়িতে দেবী মনসার মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন।
পরে দেবী মনসার স্বপ্নাদেশে পাশের একটি বকুলগাছের নিচে বসে তিনি ‘পদ্মপুরাণ’ বা ‘মনসামঙ্গল’ কাব্য রচনা করেন। সেই থেকে ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন স্থানের মতো পঞ্জিকা অনুযায়ী শ্রাবণ মাসের শেষ দিনে দেবী মনসার পূজা প্রচলিত হয়ে আসছে। একই সঙ্গে গৈলা মনসা মন্দিরেও নিত্য পূজা-অর্চনার পাশাপাশি প্রতিবছর বার্ষিক পূজা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।
বাংলা সাহিত্যের অন্যতম অমর কাব্য হিসেবে ‘মনসামঙ্গল’ আজও বাঙালির লোকঐতিহ্য, ধর্মীয় সংস্কৃতি ও সাহিত্যচর্চায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।

